ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১২): আবু লাহাবের পরিণতির ভবিষ্যদ্বাণী

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

পর্ব ৩ ও ৭-এ আমরা দেখেছি, কুরআন ও নবীজি (সা.) ভবিষ্যতের অনেক সংবাদ দিয়েছেন। আজকের ভবিষ্যদ্বাণীটি সবচেয়ে অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এটি মিথ্যা প্রমাণ করার ক্ষমতা ছিল একজন মানুষের হাতে, আর সেই মানুষটি ছিল নবীজির সবচেয়ে বড় শত্রুদের একজন।

আবু লাহাব কে?

আবু লাহাব ছিল নবীজি (সা.)-এর আপন চাচা। কিন্তু ইসলামের ঘোরতর শত্রু। নবীজি যখন সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে প্রথম প্রকাশ্য দাওয়াত দিলেন, তখন আবু লাহাবই সবার আগে বলে উঠল, "তোমার ধ্বংস হোক! এজন্যই কি আমাদের জড়ো করেছ?" (সহিহ বুখারি)

এরপর সে নবীজি যেখানে দাওয়াত দিতেন, পেছনে পেছনে গিয়ে লোকদের বলত, এর কথা শুনো না, এ মিথ্যাবাদী। তার স্ত্রী উম্মে জামিল নবীজির চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত।

কুরআনের ঘোষণা

এই প্রেক্ষাপটে নাযিল হলো সূরা লাহাব: "ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, এবং ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও। তার ধনসম্পদ আর তার উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি। অচিরেই সে প্রবেশ করবে লেলিহান শিখাময় আগুনে। আর তার স্ত্রীও, যে কাঠ বহনকারী। তার গলায় থাকবে খেজুর আঁশের পাকানো রশি।" (সূরা লাহাব ১১১:১-৫)

এই সূরার অর্থ স্পষ্ট: আবু লাহাব ও তার স্ত্রী জাহান্নামি। আর ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুযায়ী, যে ঈমান এনে মারা যায়, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হয় না। অর্থাৎ কুরআন ঘোষণা দিল, এই দুজন কখনো ঈমান আনবে না, কুফরের ওপরই মারা যাবে।

দশ বছরের খোলা সুযোগ

এই সূরা নাযিল হয়েছিল মক্কি যুগের শুরুর দিকে। আর আবু লাহাব মারা যায় বদর যুদ্ধের কিছুদিন পর, হিজরি দ্বিতীয় সনে। অর্থাৎ সূরা নাযিলের পর সে প্রায় দশ বছর জীবিত ছিল।

এই দশ বছরে সে খুব সহজেই কুরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারত। তাকে কোনো যুদ্ধ করতে হতো না, কোনো সম্পদ ব্যয় করতে হতো না। শুধু মক্কার বাজারে দাঁড়িয়ে একবার বলতে হতো, "আমি মুসলমান হলাম।" মন থেকে না হোক, শুধু মুখে বললেই হতো। তারপর সবাইকে বলতে পারত, দেখো, মুহাম্মদের কিতাব বলেছে আমি কাফের হয়ে মরব, অথচ আমি মুসলমান! তোমাদের নবী মিথ্যাবাদী!

এটা হতো ইসলামের বিরুদ্ধে তার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। অথচ এই সহজতম কাজটি সে কখনো করেনি।

অন্যরা কিন্তু বদলেছে

লক্ষণীয় যে, এই দশ বছরে এবং এর পরে ইসলামের অনেক কঠোর শত্রু ঈমান এনেছেন। হযরত উমর (রা.), যিনি নবীজিকে হত্যা করতে বেরিয়েছিলেন, মুসলমান হয়েছেন। পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, ওয়াহশি, এমন বহু শত্রু ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু যাদের সম্পর্কে কুরআন নাম ধরে ঘোষণা দিয়েছিল, সেই আবু লাহাব ও তার স্ত্রী কখনো ঈমান আনেনি।

তার করুণ মৃত্যু

ইতিহাসগ্রন্থে বর্ণিত আছে, বদর যুদ্ধে কুরাইশের পরাজয়ের সংবাদ শোনার কিছুদিন পর আবু লাহাব এক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। রোগের ভয়ে তার নিজের সন্তানরাও তার কাছে যেত না। কয়েকদিন তার লাশ পড়ে থাকে। পরে লোকনিন্দার ভয়ে দূর থেকে পানি ছিটিয়ে, লাঠি দিয়ে ঠেলে গর্তে ফেলে পাথর চাপা দেওয়া হয়। তার সম্পদ আর উপার্জন সত্যিই তার কোনো কাজে আসেনি।

কেন এটি প্রমাণ?

একটু ভাবুন। যদি মুহাম্মদ (সা.) নিজে কুরআন রচনা করতেন, তবে কি তিনি এমন একটি ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, যা মিথ্যা প্রমাণ করার পুরো ক্ষমতা তাঁর শত্রুর হাতে? একজন বুদ্ধিমান মানুষ কখনো তার সমস্ত দাবিকে এমন একজনের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয় না, যে তাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। মানুষের মন কখন কোন দিকে ঘুরবে, তা কোনো মানুষ জানে না। কিন্তু যিনি হৃদয়ের মালিক, তিনি জানেন। তাই তিনি নিশ্চিত করে বলতে পেরেছেন।

উপসংহার

আবু লাহাবের হাতে ছিল দশ বছর, আর কুরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য দরকার ছিল মাত্র একটি বাক্য। সে সেই বাক্য কখনো বলেনি। এই নীরবতাই চিৎকার করে সাক্ষ্য দেয়, কুরআন সেই আল্লাহর বাণী, যিনি মানুষের অন্তরের খবর জানেন এবং ভবিষ্যৎ যাঁর কাছে স্পষ্ট।

আগামী পর্বে থাকছে ত্রয়োদশ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।