ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৩): পূর্ববর্তী কিতাবে নবীজির সুসংবাদ
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
নবীজি (সা.) কোনো নতুন ধর্ম আবিষ্কারের দাবি করেননি। তিনি বলেছেন, তিনি সেই একই নবুওয়াতের ধারার শেষ নবী, যে ধারায় এসেছিলেন ইবরাহিম, মূসা ও ঈসা (আ.)। শুধু তাই নয়, তিনি দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী নবীরা তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। এটি এমন এক দাবি, যা যাচাই করার সুযোগ তাঁর সমকালীন মানুষের হাতেই ছিল।
কুরআনের দাবি
আল্লাহ তাআলা বলেন, "যারা অনুসরণ করে সেই রাসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর কথা তারা তাদের কাছে থাকা তাওরাত ও ইনজিলে লিখিত পায়।" (সূরা আরাফ ৭:১৫৭)
আরও বলেন, "স্মরণ করো, যখন মারইয়াম-পুত্র ঈসা বলেছিল, হে বনী ইসরাঈল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল, আমার পূর্বে আসা তাওরাতের সত্যায়নকারী, এবং এমন এক রাসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আসবেন, যাঁর নাম আহমাদ।" (সূরা সফ ৬১:৬)
আর আহলে কিতাবের পণ্ডিতদের সম্পর্কে বলেন, "যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে এমনভাবে চেনে, যেভাবে নিজেদের সন্তানদের চেনে।" (সূরা বাকারা ২:১৪৬)
দাবিটি কাদের সামনে করা হয়েছিল?
এই বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার মতো। মদিনায় তখন ইহুদিদের তিনটি বড় গোত্র বাস করত, যাদের মধ্যে ছিলেন তাওরাতের বড় বড় পণ্ডিত। আশপাশে ছিল নাজরানের খ্রিস্টান সম্প্রদায়, আর উত্তরে শাম ও রোমে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের বিশাল সমাজ।
যদি তাদের কিতাবে এমন কোনো ভবিষ্যদ্বাণী না থাকত, তবে কুরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করা ছিল খুবই সহজ। তারা শুধু কিতাব খুলে বলত, দেখাও কোথায় লেখা আছে? একজন মিথ্যা দাবিদার কখনো এমন দাবি করত না, যা তার সবচেয়ে জ্ঞানী প্রতিপক্ষরা হাতের কাছে থাকা বই দিয়েই খণ্ডন করতে পারে।
বাইবেলে যা পাওয়া যায়
শত শত বছর ধরে নানা অনুবাদ ও পরিবর্তনের পরেও বাইবেলে এমন কিছু বাণী রয়ে গেছে, মুসলিম আলেমগণ যেগুলোকে নবীজির দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন।
১. মূসার মতো এক নবী
তাওরাতে আল্লাহ মূসা (আ.)-কে বলছেন, "আমি তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার মতো একজন নবী তাদের জন্য উত্থিত করব, এবং আমার বাণী তার মুখে দেব। আমি তাকে যা আদেশ করব, সে তাদের তা বলবে।" (দ্বিতীয় বিবরণ বা Deuteronomy ১৮:১৮)
মুসলিম আলেমগণ এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করেন। "তাদের ভাইদের মধ্য থেকে", বনী ইসরাঈলের ভাই হলো ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর, অর্থাৎ আরবরা। "তোমার মতো", মূসা (আ.)-এর মতো নবীজিও ছিলেন একাধারে নবী, শরিয়ত প্রবর্তক, রাষ্ট্রনেতা ও সেনাপতি; তাঁরও স্বাভাবিক জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু হয়েছে। "আমার বাণী তার মুখে দেব", নবীজি নিজে পড়তে-লিখতে জানতেন না, তাঁর মুখে আল্লাহর বাণী দেওয়া হয়েছে, আর তিনি তা হুবহু পৌঁছে দিয়েছেন।
২. সান্ত্বনাদাতা বা প্যারাক্লিট
ইউহোন্নার সুসমাচারে (Gospel of John) হযরত ঈসা (আ.) বলছেন, "আমি পিতার কাছে চাইব, আর তিনি তোমাদের আরেকজন সাহায্যকারী (Paraclete) দেবেন, যিনি চিরকাল তোমাদের সাথে থাকবেন।" (যোহন ১৪:১৬) আরও বলছেন, "তিনি নিজে থেকে কিছু বলবেন না, বরং যা শুনবেন তা-ই বলবেন, এবং আগামী বিষয়ের সংবাদ দেবেন।" (যোহন ১৬:১৩)
খ্রিস্টানরা সাধারণত এর অর্থ পবিত্র আত্মা বলে মনে করেন। তবে মুসলিম আলেমগণ বলেন, এই বর্ণনা, "নিজে থেকে বলবেন না, যা শুনবেন তা-ই বলবেন", হুবহু মিলে যায় কুরআনের এই আয়াতের সাথে: "তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটা তো ওহি যা তাঁর প্রতি প্রেরণ করা হয়।" (সূরা নাজম ৫৩:৩-৪) আর "আরেকজন সাহায্যকারী", যিনি "চিরকাল" থাকবেন, অর্থাৎ শেষ নবী, যাঁর শিক্ষা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
৩. পারানের পাহাড় থেকে
তাওরাতে বলা হয়েছে, "প্রভু সিনাই থেকে এলেন, সেয়ীর থেকে তাদের ওপর উদিত হলেন, পারান পর্বত থেকে আলো ছড়ালেন।" (দ্বিতীয় বিবরণ ৩৩:২) মুসলিম আলেমগণের ব্যাখ্যায়, সিনাই হলো মূসা (আ.)-এর ওহির স্থান, সেয়ীর ফিলিস্তিনের দিকে ঈসা (আ.)-এর এলাকা, আর পারান হলো সেই প্রান্তর, যেখানে তাওরাত অনুযায়ী ইসমাঈল (আ.) বসবাস করেছিলেন (আদিপুস্তক ২১:২১), যাকে মুসলিম আলেমগণ মক্কার অঞ্চল বলে চিহ্নিত করেন।
যাঁরা চিনে ঈমান এনেছেন
সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য হলো সেই যুগের আহলে কিতাব পণ্ডিতদের নিজেদের অবস্থান।
আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) ছিলেন মদিনার ইহুদিদের সবচেয়ে সম্মানিত আলেম। নবীজি মদিনায় আসার পর তিনি তাঁকে দেখতে গেলেন এবং কয়েকটি প্রশ্ন করে ঈমান আনলেন। তিনি বলেন, নবীজির চেহারা দেখেই বুঝেছিলাম, এটি কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। (সুনানে তিরমিযি; প্রশ্নোত্তরের ঘটনা সহিহ বুখারিতে)
সালমান ফারসি (রা.) পারস্যের এক অগ্নিপূজক পরিবার ছেড়ে সত্যের খোঁজে একের পর এক খ্রিস্টান সাধকের কাছে গেছেন। তাঁর শেষ শিক্ষক মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, আরবের খেজুর বাগানঘেরা এক ভূমিতে শেষ নবী আসবেন, তাঁর কিছু নিদর্শন থাকবে। সেই নিদর্শন মিলিয়ে সালমান (রা.) মদিনায় নবীজিকে চিনেছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ)
হাবশার খ্রিস্টান বাদশাহ নাজাশি কুরআনে মারইয়াম (আ.)-এর বর্ণনা শুনে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, এই বাণী আর ঈসা যা নিয়ে এসেছিলেন, তা একই আলোর উৎস থেকে এসেছে। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাঁর মৃত্যুর পর নবীজি মদিনায় তাঁর গায়েবানা জানাজা পড়েন। (সহিহ বুখারি)
আর রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস, যার কথা পর্ব ৪-এ এসেছে, আবু সুফিয়ানকে প্রশ্ন করার পর বলেছিলেন, "আমি জানতাম, এই নবী আসবেন, কিন্তু ভাবিনি তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন।" (সহিহ বুখারি)
কেন এটি প্রমাণ?
নবীজি এমন এক দাবি করেছিলেন, যা খণ্ডন করার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ছিল সেই যুগের ইহুদি ও খ্রিস্টান পণ্ডিতদের হাতে। কিছু পণ্ডিত অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ও নিষ্ঠাবান অনেকে নবীজিকে চিনে ঈমান এনেছেন। একজন মিথ্যা দাবিদারকে কি তার প্রতিপক্ষ ধর্মের শ্রেষ্ঠ আলেমরা নিজেদের কিতাবের আলোকে স্বীকৃতি দিতেন?
উপসংহার
নবুওয়াতের যে ধারা হযরত ইবরাহিম (আ.) থেকে শুরু হয়েছিল, সেই ধারার নবীরা পরবর্তী নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। মুহাম্মদ (সা.) সেই সুসংবাদের পূর্ণতা। তিনি নতুন কোনো সত্য আনেননি, বরং সব নবীর আনা সেই চিরন্তন সত্যকে পূর্ণ করেছেন।
আগামী পর্বে থাকছে চতুর্দশ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।




