ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৪): চোখের সামনে ঘটা মুজিযা
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে বড় মুজিযা আল-কুরআন, যা পর্ব ১, ২, ১০ ও ১১-এ আমরা দেখেছি। এটি চিরন্তন মুজিযা, আজও যে কেউ তা পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা তাঁর হাতে আরও অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা তাঁর সমকালীন মানুষ নিজের চোখে দেখেছে।
আজকের আলোচনার মূল বিষয় শুধু মুজিযাগুলো নয়, বরং সেগুলোর সাক্ষী কারা, এবং কতজন।
১. আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানির ধারা
হুদায়বিয়ার সফরে সাহাবিরা প্রচণ্ড পিপাসার্ত। অজু বা পান করার মতো পানি শেষ, শুধু নবীজির সামনে একটি ছোট পাত্রে সামান্য পানি। নবীজি সেই পাত্রে হাত রাখলেন, আর তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরনার মতো পানি বের হতে লাগল। সবাই পান করলেন, অজু করলেন।
সাহাবি জাবির (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, "আমরা যদি এক লক্ষও হতাম, তবুও তা যথেষ্ট হতো। আমরা ছিলাম পনেরোশ।" (সহিহ বুখারি)
পনেরোশ মানুষ একসাথে দেখেছেন, একসাথে পান করেছেন। আর হযরত আনাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) সহ আরও অনেক সাহাবি বিভিন্ন সময়ে পানির এমন মুজিযার বর্ণনা দিয়েছেন।
২. খন্দকের দিনে খাবারের বরকত
খন্দক যুদ্ধের সময় সাহাবিরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় পরিখা খুঁড়ছিলেন। হযরত জাবির (রা.) দেখলেন, নবীজির পেটে ক্ষুধার কারণে পাথর বাঁধা। তিনি ঘরে গিয়ে একটি ছোট ছাগলছানা জবাই করলেন, আর স্ত্রী অল্প কিছু যবের রুটি তৈরি করলেন, যা কয়েকজনের খাবার মাত্র। তিনি চুপিচুপি নবীজিকে দাওয়াত দিলেন।
নবীজি পুরো খন্দকবাসীকে ডেকে নিয়ে এলেন। জাবির (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, তারা ছিল এক হাজার জন। সবাই পেট ভরে খেয়ে চলে গেল, অথচ আমাদের হাঁড়ি তখনো আগের মতো ফুটছিল, আর আটা থেকে আগের মতোই রুটি তৈরি হচ্ছিল। (সহিহ বুখারি)
৩. খেজুর গাছের কাণ্ডের কান্না
মসজিদে নববীতে নবীজি একটি খেজুর গাছের কাণ্ডে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। পরে তাঁর জন্য একটি মিম্বর তৈরি করা হলো। প্রথম যেদিন তিনি মিম্বরে দাঁড়ালেন, মসজিদভর্তি মানুষ শুনল, সেই কাণ্ড থেকে শিশুর মতো কান্নার শব্দ আসছে। নবীজি নেমে এসে কাণ্ডটিকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন তা ধীরে ধীরে শান্ত হলো। (সহিহ বুখারি)
এই ঘটনা জুমার দিনে মসজিদভর্তি সাহাবিদের সামনে ঘটেছে। হাদিস বিশারদগণ বলেছেন, এটি দশজনেরও বেশি সাহাবি থেকে বর্ণিত, ফলে এর বর্ণনা মুতাওয়াতির পর্যায়ের।
৪. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া
মক্কার মুশরিকরা নবীজির কাছে একটি নিদর্শন দাবি করল। তখন তারা দেখল, চাঁদ দুই টুকরো হয়ে গেছে, এক টুকরো পাহাড়ের এক পাশে, আরেক টুকরো অন্য পাশে। নবীজি বললেন, "তোমরা সাক্ষী থাকো।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই ঘটনার পর নাযিল হলো, "কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোনো নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত যাদু।" (সূরা কামার ৫৪:১-২)
লক্ষ্য করুন, এই আয়াতগুলো মক্কার মানুষের সামনে প্রকাশ্যে পড়া হতো। যদি চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা না ঘটত, তবে মুশরিকরা সঙ্গে সঙ্গে বলত, আমরা তো কিছুই দেখিনি, তোমার কিতাব মিথ্যা বলছে। তারা তা বলেনি। বরং কুরআন নিজেই তাদের প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেছে, তারা একে যাদু বলেছিল। অর্থাৎ ঘটনাটি তারা অস্বীকার করেনি, শুধু তার ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক করেছে।
যাদুকর বলাই স্বীকৃতি
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। নবীজির শত্রুরা কখনো বলেনি, এসব ঘটনা ঘটেইনি। তারা বলেছে, তিনি যাদুকর। কুরআন তাদের এই কথা বারবার উল্লেখ করেছে। আর কাউকে যাদুকর বলার অর্থই হলো, তার হাতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে, যার ব্যাখ্যা তারা খুঁজে পাচ্ছে না। শত্রুর এই অভিযোগই প্রমাণ করে, ঘটনাগুলো সবার চোখের সামনে ঘটেছিল।
কিন্তু যাদুকরের যাদু চোখের ভ্রম, যা পানি পিপাসা মেটায় না, খাবার পেট ভরায় না। অথচ পনেরোশ মানুষ সত্যিই পান করেছেন, এক হাজার মানুষ সত্যিই পেট ভরে খেয়েছেন।
কেন এটি প্রমাণ?
একজন মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, দশজন হয়তো ষড়যন্ত্র করতে পারে। কিন্তু পনেরোশ বা এক হাজার মানুষ, যাঁরা ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের, ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের, পরবর্তীতে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন, তাঁরা সবাই মিলে একই মিথ্যা বানাবেন এবং আজীবন তা গোপন রাখবেন, এটা অসম্ভব। হাদিসশাস্ত্রে এমন বর্ণনাকে বলা হয় মুতাওয়াতির, অর্থাৎ এত বেশি সূত্রে বর্ণিত যে মিথ্যার সম্ভাবনা থাকে না। আর নবীজির মুজিযার সামগ্রিক বর্ণনা নিশ্চিতভাবেই এই পর্যায়ের।
উপসংহার
নবীজির মুজিযা কোনো গোপন কক্ষে, দুই-একজনের সামনে ঘটেনি। ঘটেছে খোলা প্রান্তরে, যুদ্ধের ময়দানে, জুমার মসজিদে, শত্রুর চোখের সামনে। সাক্ষী হাজারো মানুষ, আর শত্রুরাও অস্বীকার করতে পারেনি। আল্লাহ এসব নিদর্শনের মাধ্যমে সাক্ষ্য দিয়েছেন, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সত্য রাসূল।
আগামী পর্বে থাকছে পঞ্চদশ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।




