ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ২): কুরআনের অবিকৃত সংরক্ষণ
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
একটি গ্রন্থ যদি সত্যিই আল্লাহর বাণী হয়, তবে সেই বাণী মানুষের কাছে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছানো জরুরি। নইলে মানুষ জানবে কীভাবে, কোনটা আল্লাহর কথা আর কোনটা মানুষের সংযোজন? কুরআন এই প্রশ্নের এমন এক জবাব দিয়েছে, যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই।
আল্লাহর আগাম ঘোষণা
আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আমিই এই উপদেশ (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।" (সূরা হিজর ১৫:৯)
আরও বলেন, "বাতিল এতে প্রবেশ করতে পারে না, সামনে থেকেও না, পেছন থেকেও না। এটি প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।" (সূরা হা-মীম সাজদা ৪১:৪২)
ভেবে দেখুন, এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এমন সময়ে, যখন মুসলমানরা ছিল দুর্বল, সংখ্যায় অল্প, শত্রুবেষ্টিত। কোনো মানুষ তখন নিশ্চিত করে বলতে পারত না, এই কিতাব কয়েক বছর পরও টিকে থাকবে কি না। অথচ চৌদ্দশ বছর পর আজ আমরা দেখছি, ঘোষণাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে।
দুই পথে সংরক্ষণ: বুকে ও কাগজে
কুরআন সংরক্ষিত হয়েছে একসাথে দুইভাবে।
প্রথমত, মুখস্থের মাধ্যমে। নবীজি (সা.) নিজে কুরআন মুখস্থ করতেন, সাহাবিদের মুখস্থ করাতেন। প্রতি রমজানে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে পুরো কুরআন মিলিয়ে নিতেন। সেই ধারা আজও চলছে। পৃথিবীতে এখন লক্ষ লক্ষ হাফেজ আছেন, যাঁদের অনেকে আরবি ভাষাই বোঝেন না, তবু প্রথম অক্ষর থেকে শেষ অক্ষর পর্যন্ত নির্ভুল তেলাওয়াত করতে পারেন। কাল যদি পৃথিবীর সব কুরআনের কপি হারিয়েও যায়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাফেজরা হুবহু আবার লিখে দিতে পারবেন। অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রে এমনটা কল্পনাও করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, লেখার মাধ্যমে। ওহি নাযিল হওয়ার সাথে সাথে নবীজির নির্দেশে ওহি-লেখক সাহাবিরা তা লিখে রাখতেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে পুরো কুরআন এক মলাটে সংকলিত হয়। হযরত উসমান (রা.) সেই কপি থেকে প্রমিত মুসহাফ তৈরি করে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।
পাণ্ডুলিপির সাক্ষ্য
আধুনিক বিজ্ঞানও এই সংরক্ষণের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত কুরআনের কিছু প্রাচীন পাতার রেডিওকার্বন পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, এর চামড়া নবীজির জীবদ্দশা বা তার খুব কাছাকাছি সময়ের। আর সেই পাতাগুলোর লেখা আজকের কুরআনের সাথে হুবহু মিলে যায়। বিশ্বের নানা জাদুঘরে থাকা প্রথম শতাব্দীর অন্যান্য পাণ্ডুলিপিও একই সাক্ষ্য দেয়।
অন্য ধর্মগ্রন্থের সাথে তুলনা
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোর মূল ভাষার মূল কপি আজ আর পাওয়া যায় না। সেগুলোর বিভিন্ন সংস্করণে পার্থক্য আছে, কোন অংশ মূল আর কোন অংশ পরবর্তী সংযোজন, তা নিয়ে সেসব ধর্মের পণ্ডিতরাই বিতর্ক করেন। অথচ কুরআন আজও নাযিলের ভাষা আরবিতে, একই শব্দে, একই বিন্যাসে পড়া হয়। ঢাকা, সিউল, কায়রো কিংবা লন্ডন, যেখানেই যান, কুরআন একটাই।
উপসংহার
একজন সত্যান্বেষী মানুষ ভাবুন: সপ্তম শতাব্দীর মরুভূমির এক মানুষ কীভাবে নিশ্চিত হতে পারলেন যে তাঁর আনা কিতাব কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে? এবং কীভাবে সেটি সত্যিই অবিকৃত রইল, যখন পৃথিবীর অন্য সব প্রাচীন গ্রন্থ পরিবর্তনের শিকার হয়েছে? এর একমাত্র ব্যাখ্যা, এই কিতাবের রক্ষক স্বয়ং আল্লাহ, আর তিনিই এটি নাযিল করেছেন।
আগামী পর্বে থাকছে তৃতীয় প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।




