ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৭): নবীজির সত্য ভবিষ্যদ্বাণী
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
পর্ব ৩-এ আমরা দেখেছি, কুরআন রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল এবং তা সত্য হয়েছে। কুরআনের পাশাপাশি নবীজি (সা.)-ও তাঁর হাদিসে ভবিষ্যতের বহু ঘটনার সংবাদ দিয়েছেন। এসব ভবিষ্যদ্বাণী নির্দিষ্ট, স্পষ্ট এবং ঘটনা ঘটার বহু আগেই সাহাবিদের মাধ্যমে বর্ণিত ও গ্রন্থে লিপিবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তিনি মনগড়া কথা বলেন না। এটা তো ওহি, যা তাঁর প্রতি প্রেরণ করা হয়।" (সূরা নাজম ৫৩:৩-৪)
আজ আমরা এমন কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী দেখব।
১. রাখালদের উঁচু অট্টালিকার প্রতিযোগিতা
হাদিসে জিবরীলে নবীজি (সা.) কিয়ামতের আলামত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "তুমি দেখবে, খালি পা, বস্ত্রহীন, দরিদ্র ছাগলের রাখালরা উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে।" (সহিহ মুসলিম)
চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুভূমিতে মানুষ তাঁবু আর মাটির ঘরে থাকত। কেউ কল্পনাও করতে পারত না, সেই মরুভূমির রাখালদের বংশধররা একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। অথচ আজ আরব উপদ্বীপেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের সর্বোচ্চ অট্টালিকা, আর তাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।
২. পারস্য ও রোম বিজয়ের সুসংবাদ
খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন চরম বিপদে, চারদিক থেকে শত্রু ঘিরে আছে, ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে পরিখা খুঁড়ছেন, তখন একটি শক্ত পাথর ভাঙতে গিয়ে নবীজি (সা.) সুসংবাদ দিলেন, শাম, পারস্য ও ইয়েমেনের ভূমি মুসলমানদের হাতে আসবে। (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে নাসায়ী)
যে মুহূর্তে মুসলমানরা মদিনা রক্ষা করতে পারবে কি না সেটাই অনিশ্চিত, সেই মুহূর্তে বিশ্বের দুই পরাশক্তি জয়ের সংবাদ! মুনাফিকরা এ নিয়ে উপহাস করেছিল। অথচ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে এই সবগুলো অঞ্চল মুসলমানদের অধীনে আসে।
৩. নিরাপত্তার সুসংবাদ
সাহাবি আদি ইবনে হাতিম (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) আমাকে বলেছিলেন, "তুমি যদি দীর্ঘ জীবন পাও, তবে দেখবে একজন নারী হিরা (ইরাক) থেকে একাকী সফর করে এসে কাবা তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না।" সে সময় আরবের পথে পথে ডাকাতের ভয়। আদি (রা.) পরে বলেন, "আমি নিজের চোখে সেই নারীকে দেখেছি।" (সহিহ বুখারি)
৪. হযরত ফাতিমা (রা.)-কে দেওয়া সংবাদ
মৃত্যুশয্যায় নবীজি (সা.) কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে কানে কানে বললেন, পরিবারের মধ্যে তিনিই সবার আগে নবীজির সাথে মিলিত হবেন। (সহিহ বুখারি) নবীজির ইন্তেকালের প্রায় ছয় মাস পর ফাতিমা (রা.) ইন্তেকাল করেন। নবীজির পরিবারের মধ্যে তিনিই প্রথম।
ভাবুন, কোনো মিথ্যাবাদী কি নিজের প্রিয় কন্যার মৃত্যু সম্পর্কে এমন নির্দিষ্ট কথা বলার ঝুঁকি নেবে? যদি কন্যা দীর্ঘজীবী হতেন, তবে এই একটি কথাই তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করত।
৫. হযরত হাসান (রা.)-এর সমঝোতা
নবীজি (সা.) শিশু হাসান (রা.)-কে দেখিয়ে বলেছিলেন, "আমার এই সন্তান নেতা। আশা করি আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলমানদের দুটি বড় দলের মাঝে সমঝোতা করাবেন।" (সহিহ বুখারি)
প্রায় ত্রিশ বছর পর, ৪১ হিজরিতে, মুসলমানদের দুটি বিশাল বাহিনী যখন মুখোমুখি, তখন হযরত হাসান (রা.) খেলাফতের দাবি ছেড়ে দিয়ে সমঝোতা করেন। রক্তপাত বন্ধ হয়, উম্মাহ আবার এক হয়। ইতিহাসে বছরটি "আমুল জামাআহ", অর্থাৎ ঐক্যের বছর নামে পরিচিত।
কেন এগুলো কাকতালীয় নয়?
একটি-দুটি অনুমান কাকতালীয়ভাবে মিলে যেতে পারে। কিন্তু এখানে আমরা দেখছি বহু ভবিষ্যদ্বাণী, যা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানের নাম ধরে করা হয়েছে, এবং প্রতিটি হুবহু সত্য হয়েছে। জ্যোতিষী বা গণকরা অস্পষ্ট কথা বলে, যাতে যেকোনো ফলাফলের সাথে মিলিয়ে দেওয়া যায়। অথচ নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী ছিল স্পষ্ট, যাচাইযোগ্য এবং ভুল হলে তা সহজেই ধরা পড়ত।
উপসংহার
যিনি অদৃশ্যের এমন নির্ভুল সংবাদ দিয়েছেন, তিনি নিজে থেকে বলেননি। তাঁকে জানিয়েছেন সেই সত্তা, যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু জানেন। আর এটাই প্রমাণ করে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সত্য রাসূল।
আগামী পর্বে থাকছে অষ্টম প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।




