ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৯): এক জাতির অবিশ্বাস্য রূপান্তর
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
একটি গাছকে চেনা যায় তার ফল দিয়ে। একটি বাণী সত্য কি না, তা বোঝার একটি পথ হলো দেখা, সেই বাণী মানুষকে কী বানিয়েছে। ইসলামের আগে আরবরা কেমন ছিল, আর ইসলাম তাদের কী বানিয়েছে, এই তুলনাটিই আজকের প্রমাণ।
ইসলামের আগে আরব
ইসলামের আগের যুগকে বলা হয় জাহেলিয়াত, অর্থাৎ অজ্ঞতার যুগ। কাবা ঘরের চারপাশে ছিল ৩৬০টি মূর্তি। (সহিহ বুখারি) অনেক পিতা কন্যাসন্তানকে লজ্জার কারণ মনে করে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। কুরআন সেই নিষ্পাপ শিশুদের পক্ষ নিয়ে বলেছে, "যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?" (সূরা তাকভীর ৮১:৮-৯)
গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ চলত তুচ্ছ কারণে, আর তা চলত প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মদিনার দুই গোত্র আওস ও খাযরাজ বছরের পর বছর একে অপরের রক্ত ঝরিয়েছে। মদ, জুয়া, সুদ আর অশ্লীলতা ছিল সমাজের স্বাভাবিক অংশ। দুর্বলের কোনো অধিকার ছিল না, দাস আর নারীর কোনো মর্যাদা ছিল না।
জাফর (রা.)-এর ভাষণ
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন নবীজির চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)। হাবশার খ্রিস্টান বাদশাহ নাজাশির দরবারে তিনি বলেছিলেন, "হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম এক অজ্ঞ জাতি। মূর্তিপূজা করতাম, মৃত প্রাণী খেতাম, অশ্লীল কাজ করতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করতাম, আমাদের সবলরা দুর্বলদের গ্রাস করত। এমন সময় আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠালেন, যাঁর বংশ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও পবিত্রতা আমরা জানি। তিনি আমাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকলেন, সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করতে এবং রক্তপাত ও হারাম থেকে বিরত থাকতে আদেশ দিলেন।" (মুসনাদে আহমাদ)
শত্রু থেকে ভাই
যে আওস ও খাযরাজ একে অপরের রক্তের পিপাসু ছিল, ইসলাম তাদের ভাই বানিয়ে দিল। আল্লাহ বলেন, "তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের হৃদয়গুলোকে জুড়ে দিলেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে।" (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩)
মদিনার আনসাররা মক্কা থেকে আসা নিঃস্ব মুহাজির ভাইদের নিজেদের ঘর, ফসল, সম্পদ ভাগ করে দিলেন। হাবশি দাস বিলাল (রা.), পারস্যের সালমান (রা.), রোমের সুহাইব (রা.), আর কুরাইশের অভিজাত আবু বকর (রা.), সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লেন। বংশ, বর্ণ আর ভাষার অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
আল্লাহ এই ঐক্যকে নিজের কুদরতের নিদর্শন বলেছেন, "আপনি যদি পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ব্যয় করতেন, তবুও তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মাঝে প্রীতি স্থাপন করেছেন।" (সূরা আনফাল ৮:৬৩)
একটি আয়াতে মদ বন্ধ
মদ ছিল আরবদের রক্তে মিশে থাকা অভ্যাস। তাদের কবিতা ভরা ছিল মদের প্রশংসায়। অথচ যখন মদ হারাম হওয়ার চূড়ান্ত আয়াত নাযিল হলো, হযরত আনাস (রা.) বলেন, ঘোষণা শোনামাত্র লোকেরা মদের পাত্র ভেঙে ফেলল, আর মদিনার অলিগলিতে মদ বয়ে গেল। (সহিহ বুখারি) কোনো পুলিশ লাগেনি, কোনো জেল লাগেনি।
এর সাথে তুলনা করুন আধুনিক যুগের একটি দৃষ্টান্ত। ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইন করে মদ নিষিদ্ধ করেছিল। পুলিশ, আদালত, কারাগার, সবকিছু ব্যবহার করা হয়েছিল। তবুও অবৈধ মদের ব্যবসা আর অপরাধ বেড়ে যায়, এবং ১৯৩৩ সালে সেই আইন বাতিল করতে হয়। একটি পরাশক্তি তেরো বছরে যা পারেনি, নবীজি একটি আয়াতের ঘোষণায় তা করে দেখিয়েছেন।
এক প্রজন্মে বিশ্বের নেতৃত্ব
যে আরবদের পারস্য আর রোম উপেক্ষার চোখে দেখত, নবীজির ইন্তেকালের মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ বছরের মধ্যে তারাই সেই দুই সাম্রাজ্যের ভূমিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করল। একসময়ের মরুভূমির রাখালরা হয়ে উঠলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, বিচারক আর শিক্ষক। হযরত উমর (রা.), যিনি একসময় নবীজিকে হত্যা করতে তলোয়ার নিয়ে বের হয়েছিলেন, তিনিই হলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যায়পরায়ণ শাসক।
কেন এটি প্রমাণ?
মানুষের অভ্যাস বদলানো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। একজন মানুষের একটি বদ অভ্যাস ছাড়াতে বছরের পর বছর লেগে যায়। একটি পুরো জাতির শত শত বছরের ধর্ম, সংস্কৃতি, অভ্যাস আর অহংকার মাত্র তেইশ বছরে আমূল বদলে দেওয়া, এবং সেই পরিবর্তন এত গভীর হওয়া যে তারা নিজেরাই তা সারা পৃথিবীতে বয়ে নিয়ে গেল, ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ক্ষমতা, অর্থ বা ভয় দিয়ে মানুষের বাইরের আচরণ বদলানো যায়, হৃদয় নয়। এই পরিবর্তন এসেছিল হৃদয় থেকে, আর হৃদয় বদলাতে পারেন একমাত্র আল্লাহ।
উপসংহার
যে বাণী অন্ধকারতম একটি জাতিকে পৃথিবীর আলোকবর্তিকা বানিয়ে দিতে পারে, সেই বাণী কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না। এটি সেই আল্লাহর বাণী, যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং জানেন কীসে




