ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরিহিত এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, তাকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে পেছনে গিয়ে বসতে বলার অভিযোগ উঠেছে বিভাগের শিক্ষিকা তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমি।

ফেসবুক পোস্টে রাইসা মণি সুমি লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে আজকে ভয়াবহ এবং কলঙ্কময় একটা দিন গেলো আজ। কখনো ভাবিনি যে আমার ডিপার্টমেন্টে হিজাব নিক্বাব নিয়ে একজন শিক্ষকের ইসলামবিদ্বেষী ও আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখতে হবে।’

ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘Tasneem ম্যাম সবসময় ক্লাসে আল্লাহ কে বিশ্বাসের কথা বলেন, আবার একইসাথে ইসলাম নিয়ে সেনসিটিভ কথাবার্তা বলেন যা প্রাকটিসিং যে কারো জন্যই কষ্টদায়ক। ... আজ তাই সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলো। ম্যাম শুরুতেই ক্লাসের ছেলেদের নিয়ে কটুক্তি করেন যে আমাদের স্টুডেন্টরা গরীব। এক টিশার্ট পরে প্রতিদিন ক্লাসে আসে, গায়ে গন্ধ, এরমধ্যে সবাই গাদাগাদি করে বসে।’

সুমি আরও লেখেন, ‘এসব বলতে বলতেই উনার বামে বসা পরিপূর্ণ পর্দা করে আসা আমাদের ক্লাসমেটের উপর চড়াও হয়। উনার ভাষ্যমতে, পর্দা এভাবে করে না, মুখ খোলা রাখা যায়, হাত পা ঢাকতে হয়না। ... উনি নাকি আনকম্ফোর্টেবল ও আনসেইফ ফিল করেছেন কারণ নিক্বাব পড়া শিক্ষার্থী তাকে ডিস্ট্র‍্যাক্ট করছে। মেয়েটা যেন সামনে আর না বসে। সে যেন সবার সাথে পেছনে বসে। তখনি আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করলাম, ও ওর মাজহাব অনুযায়ী এভাবে পর্দা করতে পারে। ব্যস, শুরু হলো আমার উপর চড়াও হওয়া।’

তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে উগ্রবাদী আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সুমি লেখেন, ‘আমি ফাইনালি ম্যামকে বললাম আফগানিস্তানের মানুষ আর ফিলিস্তিনের মানুষেরো তো লাইফস্টাইল আলাদা। ও সব কারণেই নিজের পর্দা করার অধিকার রাখে। এখানেই ম্যাম বলে উঠলো, "তুমি কিভাবে ওকে সাপোর্ট করো? তুমি বলতে পারবা ও যে ফান্ডামেন্টালিস্ট না? ও সন্ত্রাসী না?" এ কথায় কেউ আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। ... একে একে আমরা অধিকাংশ স্টুডেন্ট বের হয়ে ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ করলাম।’

বিভাগের অপরাপর শিক্ষকমণ্ডলীর সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী ও চেয়ারম্যান ম্যাম আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে আমাদের কোর্স টিচার চেইঞ্জ করা হবে, কিন্তু এত বছরের বায়াসড ব্যবহারের শাস্তি কি এতটুকু? ... এই ডিপার্টমেন্টে না আসলে আমরা শাহনাজ ম্যামের আদর পেতাম? কামরুল স্যারের স্নেহ পেতাম? ... তাহমিনা ম্যাম আমাকে শক্তি দিয়েছিলো, বিজয়লাল বসু স্যার আমাকে স্কলারশিপ পেতে সাহায্য করেছিলো, বশির স্যার মোটিভেশন দিয়েছিলো, সীমান্ত স্যার, নিশাত ম্যাম প্রত্যেকেই পাশে ছিলো... এরকম পরিবেশে ১৩০ জনের ক্লাসরুমে Tasneem shiraj Mahboob ম্যাম যা করেছেন, সেটা কখনোই ক্ষমাযোগ্য না। আমি একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে এর প্রতিবাদ জানালাম।’

এদিকে এই ঘটনার প্রতিবাদে ও ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত করে ওই শিক্ষিকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছে বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পৃথক পৃথক বিবৃতিতে সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা এই দাবি জানান।

গোটা মুসলিম সমাজের অবমাননা: মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ

ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘একজন মুসলিম শিক্ষার্থীকে তার ধর্মীয় পোশাকের কারণে অপমান করা শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপর আঘাত নয়; এটি গোটা মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি অবমাননা।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে যদি নিকাব, হিজাব বা ইসলামী পোশাককে বিদ্রূপ করা হয়, তাহলে সেটি নিছক মতপ্রকাশ নয়; এর মধ্যে ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতার প্রকাশ আছে। আর একজন শিক্ষকের দায়িত্বশীল অবস্থানকে ব্যবহার করে কোনো শিক্ষার্থীকে ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হলে সেটি আরও গুরুতর বিষয়। নিজেদের তথাকথিত আধুনিকতাকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে ইসলামী পোশাককে পশ্চাৎপদতা, মৌলবাদ বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা মূলত এক ধরনের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ।’

দ্বৈত মানদণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ইসলামী পোশাক দেখলেই ‘সন্ত্রাসী’ আর অশালীনতাকে দেখলেই ‘আধুনিক’—এই দ্বৈত মানদণ্ড কোনো মুক্তবুদ্ধির পরিচয় নয়। বরং এ ধরনের মানসিকতা ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সংকুচিত করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা।’

অনতিবিলম্বে তদন্ত শেষ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেবল কোর্স পরিবর্তন বা সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী যেন কোনো ধরনের একাডেমিক বা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব বলেন, ‘ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক ও মর্যাদাকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারও নেই। নিকাব পরা কোনো অপরাধ নয়, ইসলাম পালন কোনো অপরাধ নয় এবং ধর্মীয় পরিচয় কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রমাণ করতে হবে—এখানে ইসলামবিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক বৈষম্য কিংবা ফ্যাসিস্ট মানসিকতার কোনো স্থান নেই।’

শিক্ষিকা তাসনিম সিরাজের বহিষ্কার দাবি ছাত্র জমিয়তের

ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকার বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ। সংগঠনের সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী ও সাধারণ সম্পাদক সাআদ বিন জাকির বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের অংশ হিসেবে নিকাব পরিধান করলে সেটিকে কেন্দ্র করে তাকে অপমান, হেয় বা শ্রেণিকক্ষে বিব্রত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে কোনো শিক্ষার্থীকে প্রমাণ ছাড়া ‘সন্ত্রাসী’ বা উগ্রপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।’

বিভাগে ঘটা ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরিহিত এক সহপাঠীকে সামনে না বসতে এবং পেছনে গিয়ে বসতে বলা হয়। এ নিয়ে প্রতিবাদ করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকার সঙ্গে শিক্ষার্থীর বাকবিতণ্ডা হয় এবং একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ করেন বলেও ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।’

তারা আরও বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য হলে তা একজন শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও শিক্ষার অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাক নিয়ে তাকে হেয় করার জায়গা হতে পারে না। মতপার্থক্য থাকলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, ‘অভিযোগটি একতরফাভাবে গ্রহণ না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গুরুতর অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তাকে বহিষ্কারের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।’

ধর্মীয় পোশাক পরিধানকারীদের হয়রানি না করার অনুরোধ জানিয়ে তারা বলেন, ‘ধর্মীয় পোশাক পরিধানকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য, অপমান বা হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে কোনো ঘটনা নিয়ে আন্দোলন বা প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’

তারা মনে করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করা শিক্ষার সুস্থ পরিবেশের অন্যতম শর্ত। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের

ইসলামবিদ্বেষী আচরণের অভিযোগ তুলে শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স। সংগঠনের আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী ধর্মীয় পোশাক পরিধান করার কারণে তাকে অপমান, হেনস্তা বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য। একজন শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা। সেখানে কোনো শিক্ষার্থীর ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাককে কেন্দ্র করে তাকে হেয় করা শিক্ষার পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’

সংগঠনের সদস্য সচিব মাওলানা সানাউল্লাহ খান বলেন, ‘অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করে সত্যতা নিরূপণ করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব, নিকাবসহ ধর্মীয় পোশাক পরিধানকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্য, অপমান বা হয়রানি মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজকে দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো উচিত।’ তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সুরক্ষা নিশ্চিতের তাগিদ দেন।

সাধারণ আলেম সমাজের ৪ দফা দাবি

নিকাব পরিহিত শিক্ষার্থীকে অপমান ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেছে সাধারণ আলেম সমাজ। এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, নেকাব পরার কারণে ওই শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষের সামনে বসতে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং একপর্যায়ে তার ধর্মীয় অনুশীলনকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মন্তব্য করা হয়। এর প্রতিবাদে ওই শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেন।’

তারা স্পষ্ট করে বলেন, ‘নেকাব, হিজাব বা ধর্মীয় অনুশীলনকে প্রমাণ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিংবা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা ব্যক্তিগত মতামত নয়। বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে এমন আচরণ একজন শিক্ষার্থীর ধর্মীয় পরিচয়, মর্যাদা ও সমান নাগরিক অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার জায়গা নয়। নেকাব পরা কোনো অপরাধ নয় এবং ধর্মীয় অনুশীলন সন্ত্রাসবাদের আলামত নয়। একজন শিক্ষক কোনো ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে একমত না হলেও শিক্ষার্থীকে অপমান, হেয় করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার অধিকার রাখেন না।’

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও নাগরিক অপমানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের নতুন প্রত্যয় তৈরি করেছে। সেই জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে অপমান বা বৈষম্যের শিকার হতে দেওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ও এর বাইরে নয়।’

এ সময় সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে ৪টি স্পষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়:

১. অবিলম্বে তদন্তপূর্বক বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর অসদাচরণ প্রমাণিত হলে বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২. ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক ও অনুশীলনের কারণে শিক্ষার্থীদের বৈষম্য ও হয়রানি থেকে সুরক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।

৩. নেকাব বা হিজাবকে প্রমাণ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ কিংবা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করাকে ‘একাডেমিক মতামত’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া যাবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ইসলামোফোবিয়া ও ধর্মীয় বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।

৪. সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সবশেষে তারা উল্লেখ করেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশে মুসলিম শিক্ষার্থী নেকাব পরে, হিন্দু শিক্ষার্থী নিজ ধর্মীয় পরিচয়ে এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও নিজ নিজ পরিচয় নিয়ে সমান মর্যাদায় জ্ঞানচর্চা করবেন। এটাই শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক চিত্র। জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান ও যুক্তিচর্চার জায়গা, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক অপমানের জায়গা নয়। ইসলামোফোবিয়া কোনো একাডেমিক অধিকার নয় এবং কোনো শিক্ষার্থীর মর্যাদার প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই।’