আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের জনপ্রিয় আলেম ও বক্তা মুফতি তারিক মাসউদের জাপান সফরকালে দেওয়া একটি বক্তব্যের খণ্ডিত ভিডিও ক্লিপ ঘিরে জাপানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ক্লিপটি জাপানি ও ইংরেজি অনুবাদসহ এক্স (পূর্বতন টুইটার), বিভিন্ন জাপানি ব্লগ ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে জাপানি নাগরিকদের মধ্যে যেমন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তেমনি জাপানে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটির মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কে এই মুফতি তারিক মাসউদ
মুফতি তারিক মাসউদ পাকিস্তানের করাচিভিত্তিক দেওবন্দি ধারার একজন আলেম ও মুফতি। সহজ ভাষা, প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর হাস্যরসপূর্ণ বয়ানের জন্য তিনি পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের মুসলিমদের কাছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বয়ানের ভিডিও কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের মাসআলা, পারিবারিক সমস্যা ও সামাজিক বিষয়ে তাঁর সহজবোধ্য আলোচনা অনেক মানুষকে দ্বীনের প্রতি আগ্রহী করেছে। তবে তাঁর রসিকতাপূর্ণ উপস্থাপনার কারণে বিভিন্ন সময় তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। প্রবাসী মুসলিমদের আমন্ত্রণে তিনি বিভিন্ন দেশে সফর করেন, জাপানেও একাধিকবার গিয়েছেন।
ভিডিওতে যা বলা হয়েছিল
প্রচারিত অনুবাদ অনুযায়ী, জাপানে প্রবাসী মুসলিমদের এক মজলিসে জাপানের কমতে থাকা জনসংখ্যা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি রসিকতার ছলে বলেন, মুসলিম পুরুষরা জাপানি নারীদের বিয়ে করলে কয়েক প্রজন্ম পর দেশটির জনসংখ্যার চিত্র বদলে যেতে পারে। প্রাচীন গ্রিকদের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে জাতিগোষ্ঠীর রূপ বদলায়। এমনকি একসময় জাপানের নাম হয়ে যেতে পারে "জাপান খান", এমন মন্তব্যও করেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, জাপানে কোনো রাষ্ট্রধর্ম না থাকায় সেখানে দ্বীন প্রচারের সুযোগ রয়েছে।
কথাগুলো উর্দুতে, প্রবাসীদের ঘরোয়া পরিবেশে, হালকা মেজাজে বলা হয়েছিল। কিন্তু জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এর অর্থ ও প্রভাব একেবারে ভিন্ন রূপ নেয়।
জাপানে প্রতিক্রিয়া
ক্লিপটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক জাপানি নাগরিক তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ একে জাপানের সংস্কৃতি, জাতিসত্তা ও নারীদের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, জাপানি নারীরা কেন বিদেশি পুরুষদের বিয়ে করবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে অভিবাসন নীতির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবিও তুলেছেন।
উল্লেখ্য, জাপানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন, বিদেশি শ্রমিক এবং মসজিদ ও মুসলিম কবরস্থান নির্মাণ নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন বিতর্ক চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে ক্লিপটি সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মুসলিম কমিউনিটির উদ্বেগ
জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের বড় অংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী। তাঁদের পাশাপাশি ইসলাম গ্রহণকারী জাপানিরাও আছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে, স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের অনেকে আশঙ্কা করছেন, এ বিতর্ক জাপানে বিদ্যমান মুসলিমবিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে কর্মস্থল, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও মসজিদ কার্যক্রমের ওপর।
জাপানপ্রবাসী মুসলিমদের অনেকে সামাজিক মাধ্যমে জাপানি নাগরিকদের উদ্দেশে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একজন লিখেছেন, "মুফতি সাহেব গুরুতর কিছু বোঝাতে চাননি, তিনি কেবল রসিকতা করছিলেন, তাঁর এমন রসিকতার অভ্যাস আছে। তবে আমরা বুঝি, রসিকতার ছলেও এমন কথা বলা উচিত নয়। কারও অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকলে আমরা কমিউনিটির পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।"
সমর্থকদের বক্তব্য
মুফতি তারিক মাসউদের ভক্ত ও সমর্থকেরা বলছেন, বক্তব্যটি ছিল প্রবাসীদের সঙ্গে হালকা মেজাজের আলাপ, কোনো পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র বা হুমকি নয়। যাঁরা তাঁর বয়ানের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানেন, তিনি প্রায়ই অতিরঞ্জিত রসিকতার মাধ্যমে শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখেন। তাঁদের মতে, পুরো বয়ানের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ আর আক্ষরিক অনুবাদের কারণে কথার অর্থ বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এক ভাষার রসিকতা আরেক ভাষায় অনুবাদ করলে প্রায়ই গুরুতর আন্তঃসাংস্কৃতিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
লক্ষণীয় যে, ক্লিপটি সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হয়েছে এমন কিছু অ্যাকাউন্ট ও ওয়েবসাইট থেকে, যারা আগে থেকেই মুসলিমবিরোধী প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত। ফলে অনুবাদ ও উপস্থাপনার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রবাসে দাওয়াতের শিক্ষা
এ ঘটনা প্রবাসে দাওয়াতের কাজে যুক্ত সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আজকের ডিজিটাল যুগে ঘরোয়া মজলিসের কথাও মুহূর্তে বিশ্বের সব প্রান্তে পৌঁছে যায়, অনেক সময় প্রেক্ষাপট ছাড়াই। যে কথা নিজের ভাষার শ্রোতাদের কাছে নিছক রসিকতা, তা অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে আঘাত বা হুমকি হিসেবে পৌঁছাতে পারে। আর একজন বক্তার একটি বাক্যের দায় অনেক সময় বহন করতে হয় সে দেশের হাজার হাজার সাধারণ মুসলিমকে।
তাই মুসলিমরা যেখানে সংখ্যালঘু, সেখানে কথা বলার সময় আলেম ও বক্তাদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি, অনুভূতি ও সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখা দাওয়াতের অংশ। ইসলামের দাওয়াত মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যমে, জনসংখ্যার হিসাব-নিকাশ বা আধিপত্যের ভাষায় নয়।
আল্লাহ তায়ালা মুসা ও হারুন আলাইহিমাস সালামকে ফেরাউনের মতো জালিমের কাছে পাঠানোর সময়ও নির্দেশ দিয়েছিলেন,
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
"তোমরা তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।" (সূরা ত্বহা, ৪৪)
আরও বলেছেন,
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
"তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।" (সূরা নাহল, ১২৫)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
"যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
একই সঙ্গে সাধারণ মুসলিমদেরও দায়িত্ব আছে। কোনো আলেমের খণ্ডিত ক্লিপ দেখে তাঁর সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বা তাঁকে নিয়ে কটূক্তি করা যেমন অনুচিত, তেমনি ভুল হলে তা অস্বীকার না করে স্বীকার করাও ইসলামের শিক্ষা। আলেমদের প্রতি সম্মান আর সত্যের প্রতি আনুগত্য, দুটোই একসঙ্গে ধরে রাখতে হবে।
প্রবাসে প্রত্যেক মুসলিম ইসলামের প্রতিনিধি। আমাদের কথা, আচরণ ও চরিত্রই অন্যদের কাছে ইসলামের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিকমতের সঙ্গে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার তাওফিক দান করুন।




