الجواب باسم ملهم الصدق والصواب

উত্তর: জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান। এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক সমাবেশ, পারস্পরিক পরিচয় ও দ্বীনের ঐক্যের অন্যতম নিদর্শন। তাই কোনো শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া জুমা ত্যাগ করা বৈধ নয়; বরং সামর্থ্য থাকলে মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করা কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُون

[سورة الجمعة: ٩]

অর্থ: হে মুমিনগণ! জুমার দিন যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জুমার আজান হলে দুনিয়াবি ব্যস্ততা পরিত্যাগ করে আল্লাহর স্মরণ তথা জুমার নামাজের দিকে অগ্রসর হওয়া মুমিনের দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

عَنْ أَبِي الْجَعْدِ الضَّمْرِيِّ - وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ - أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَنْ تَرَكَ ثَلَاثَ جُمَعٍ تَهَاوُنًا بِهَا طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قَلْبِهِ».

[سنن أبي داود: ١٠٥٤]

অর্থ: আবুল জা‘দ আদ-দামরী রাদিয়াল্লাহু আনহু—যিনি সাহাবি ছিলেন—থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অবহেলা করে পরপর তিন জুমা ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।

তবে কোনো ব্যক্তি যদি শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে মসজিদে যেতে না পারেন, তাহলে মসজিদ ছাড়া অফিস, ফ্যাক্টরি, বাসা বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে জুমার নামাজ আদায় করা যেতে পারে—যদি জুমা শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূর্ণ থাকে।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী জুমা শুদ্ধ হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় জরুরি। যেমন—জুমার সময় হওয়া, খুতবা দেওয়া, খুতবা নামাজের আগে হওয়া, জামাত হওয়া, এমন স্থান হওয়া যেখানে জুমা প্রতিষ্ঠা করা বৈধ এবং সাধারণ মুসল্লিদের প্রবেশের অনুমতি থাকা। রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে:

«وَيُشْتَرَطُ لِصِحَّتِهَا سَبْعَةُ أَشْيَاءَ: الْأَوَّلُ: الْمِصْرُ، الثَّانِي: السُّلْطَانُ، وَالثَّالِثُ: وَقْتُ الظُّهْرِ، الرَّابِعُ: الْخُطْبَةُ فِيهِ، الْخَامِسُ: كَوْنُهَا قَبْلَهَا، السَّادِسُ: الْجَمَاعَةُ، السَّابِعُ: الْإِذْنُ الْعَامُّ.»

[رد المحتار ٣/٥، زكريا]

অর্থ: জুমা শুদ্ধ হওয়ার জন্য সাতটি বিষয় শর্ত। প্রথমত, শহর বা শহরের বিধানপ্রাপ্ত স্থান হওয়া; দ্বিতীয়ত, শাসকের অনুমতি বা তার পক্ষ থেকে জুমা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা থাকা; তৃতীয়ত, জোহরের সময় হওয়া; চতুর্থত, খুতবা দেওয়া; পঞ্চমত, নামাজের আগে খুতবা হওয়া; ষষ্ঠত, জামাত হওয়া; সপ্তমত, সাধারণভাবে অন্য নামাজি ব্যক্তির উপস্থিত হওয়ার সুযোগ থাকা।

এখানে ‘সাধারণভাবে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ বা অনুমতি’ বলতে বোঝানো হয়েছে—জুমার স্থানটি এমনভাবে বন্ধ বা সীমাবদ্ধ না থাকা, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অন্য মুসলমান সেখানে প্রবেশ করতে না পারে। তবে বাস্তব নিরাপত্তা, অফিসের নিয়ম বা কর্মস্থলের সীমাবদ্ধতার কারণে সবাই উপস্থিত হতে না পারলেও, প্রয়োজনে বাইরের কোনো মুসল্লীর জন্য প্রবেশের সুযোগ বা অনুমতি থাকা জরুরি।

জুমার জামাতের সর্বনিম্ন সংখ্যা সম্পর্কে রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে:

«السَّادِسُ: الْجَمَاعَةُ، وَأَقَلُّهَا ثَلَاثَةُ رِجَالٍ، وَلَوْ غَيْرَ الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ حَضَرُوا الْخُطْبَةَ سِوَى الْإِمَامِ بِالنَّصِّ؛ لِأَنَّهُ لَا بُدَّ مِنَ الذَّاكِرِ وَهُوَ الْخَطِيبُ، وَثَلَاثَةٍ سِوَاهُ بِنَصِّ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ.»

[رد المحتار ٣/٢٤، زكريا]

অর্থ: জুমার ষষ্ঠ শর্ত হলো জামাত। আর জামাতের সর্বনিম্ন সংখ্যা হলো ইমাম ছাড়া তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। অর্থাৎ, ইমাম বা খতিবের সঙ্গে আরও তিনজন পুরুষ থাকলে জুমার জামাতের শর্ত পূর্ণ হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে অগ্রসর হও’; আর এখানে আল্লাহর স্মরণ দ্বারা খুতবা বোঝানো হয়েছে, এবং বহু বচন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, খতীব ছাড়াও কমপক্ষে তিন জন মুসল্লী হওয়া এই শব্দ থেকেও বুঝে আসে।

জুমা শুধু মসজিদেই আদায় করতে হবে—এমনটা জরুরি নয়। বরং প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য স্থানেও জুমা আদায় করা জায়েজ আছে। সহিহ বুখারিতে এসেছে:

«كَانَ أَنَسٌ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي قَصْرِهِ أَحْيَانًا يُجَمِّعُ وَأَحْيَانًا لَا يُجَمِّعُ، وَهْوَ بِالزَّاوِيَةِ عَلَى فَرْسَخَيْنِ.»

[صحيح البخاري، كتاب الجمعة، باب من أين يؤتى الجمعة وعلى من تجب]

অর্থ: আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাড়িতে কখনো জুমার নামাজ আদায় করাতেন এবং কখনো করাতেন না। (বসরার জামে মসজিদে যেয়ে আদায় করতেন) তাঁর বাড়িটি ‘যাবিয়া’ নামক স্থানে ছিল, যা বসরা থেকে দুই ফারসাখ দূরে অবস্থিত।

ফাতহুল বারিতে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু কখনো কখনো বসরা থেকে দুই ফারসাখ দূরে অবস্থিত ‘যাবিয়া’ নামক স্থানে তাঁর নিকটবর্তী লোকদের নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করতেন এবং কখনো বসরার জামে মসজিদে গিয়ে জুমা আদায় করতেন।

[فتح الباري ٦/٦٣٤]

এ থেকে বোঝা যায়, কোনো স্থানে প্রয়োজন দেখা দিলে এবং জুমার শর্তগুলো পূর্ণ হলে মসজিদ ছাড়া অন্য স্থানেও জুমা আদায় করা বৈধ হতে পারে।

সাধারণ প্রবেশাধিকারের বিষয়ে ফতোয়ায়ে হিন্দিয়্যাতে বলা হয়েছে:

«السُّلْطَانُ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُجَمِّعَ بِحَشَمِهِ فِي دَارِهِ، فَإِنْ فَتَحَ بَابَ الدَّارِ وَأَذِنَ إِذْنًا عَامًّا جَازَتْ صَلَاتُهُ، شَهِدَهَا الْعَامَّةُ أَوْ لَمْ يَشْهَدُوهَا.»

[الفتاوى الهندية ١/٢٠٩، المكتبة الأشرفية]

অর্থ: কোনো শাসক যদি তাঁর লোকজনকে নিয়ে নিজ বাড়িতে জুমা আদায় করতে চান, তাহলে তিনি যদি বাড়ির দরজা খুলে দেন এবং সাধারণভাবে সবাইকে প্রবেশের অনুমতি দেন, তবে তাঁর জুমার নামাজ শুদ্ধ হবে—সাধারণ মানুষ সেখানে উপস্থিত হোক বা না হোক।

সুতরাং, প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে যদি সত্যিই এমন ওজর থাকে যে অফিসের দায়িত্ব ও সময়ের কারণে মসজিদে গিয়ে জুমা আদায় করা সম্ভব নয়, তাহলে অফিসে জুমা আদায় করা বৈধ হবে—শর্ত হলো:

১. অফিসটি এমন স্থানে হতে হবে যেখানে জুমা প্রতিষ্ঠা করা বৈধ;

২. জোহরের সময়ে জুমা আদায় করতে হবে;

৩. নামাজের আগে শরিয়তসম্মত খুতবা দিতে হবে;

৪. ইমাম ছাড়া অন্তত তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মুসল্লি থাকতে হবে;

৫. অফিসে জুমায় অংশগ্রহণের অনুমতি থাকতে হবে এবং স্থানটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে সীমাবদ্ধ হওয়া যাবে না।

তবে যদি মসজিদে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকে, অফিস কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া সম্ভব হয় এবং যাতায়াতে এমন কোনো অসুবিধা না থাকে যা শরিয়তসম্মত ওজর হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে মসজিদে গিয়ে জুমা আদায় করাই কর্তব্য। কারণ মসজিদে জামাতের সঙ্গে জুমা আদায়ের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। আর যদি মসজিদে যাওয়া সত্যিই সম্ভব না হয়, তাহলে জুমা ছেড়ে দিয়ে জোহরের নামাজ পড়ার পরিবর্তে উপরোক্ত শর্ত পূরণ করে অফিসে জুমা আদায় করা উত্তম।

والله أعلم بالصواب