তুরস্কের সঙ্গে ২০১৯ সালে করা সমুদ্রসীমা চুক্তি অনুমোদন করেছে খলিফা হাফতার এর নিয়ন্ত্রণে থাকা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক GNS পার্লামেন্ট। একই সঙ্গে ২০২০ সালে তুরস্ককে বয়কট করার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে তারা। এর ফলে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং তৎকালীন ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের প্রধান ফায়েজ আল-সাররাজ। এত দিন লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্ট চুক্তিটিকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। এবার সেই অবস্থান থেকে সরে আসায় আঙ্কারার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর তুরস্ক ও লিবিয়ার তৎকালীন জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামুদ্রিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়ে একটি চুক্তি সই করে। এর মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের মহীসোপান ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) সীমানা নির্ধারণের একটি কাঠামো তৈরি করে।
চুক্তিটি তুরস্কের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের সামুদ্রিক অধিকার ও জ্বালানি অনুসন্ধানের দাবি জোরদার করতে চায় আঙ্কারা। একই সঙ্গে লিবিয়ার জলসীমায় তুরস্কের অনুসন্ধান ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে চুক্তিটি শুরু থেকেই বিতর্কিত। কারণ, এর নির্ধারিত সামুদ্রিক সীমানার সঙ্গে গ্রিসের দাবিকৃত এলাকার বিরোধ রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু তুরস্ক ও লিবিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বৃহত্তর ভূরাজনীতি।
২০১৯ সালে তুরস্ক যখন ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা চুক্তি করে, তখন হাফতারের বাহিনী রাজধানী দখলের অভিযান চালাচ্ছিল। ওই সময় তুরস্ক ত্রিপোলির সরকারকে সামরিক সহায়তাও দেয়। অন্যদিকে, সমুদ্রসীমা চুক্তির মাধ্যমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পায় আঙ্কারা।
তখন হাফতারের শিবির চুক্তিটিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সেই প্রেক্ষাপটে এখন পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টের চুক্তিটি অনুমোদন করা তাৎপর্যপূর্ণ। এটি তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও সম্ভাব্য জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতা চলছে। চুক্তিটি অনুমোদিত হওয়ায় লিবিয়ার জলসীমায় তুরস্কের সামুদ্রিক অনুসন্ধান সম্প্রসারণের পথ সহজ হতে পারে।
এর পাশাপাশি পূর্ব লিবিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলে দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তুরস্কের যোগাযোগও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এত দিন ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত আঙ্কারার জন্য এটি পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সব মিলিয়ে, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টের এই সিদ্ধান্ত তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এর মাধ্যমে আঙ্কারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ও জ্বালানি স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার নতুন সুযোগ পেতে পারে। তবে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের গতিপথের ওপর।




