তরুণদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও চারিত্রিক পবিত্রতা
দেশে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ এক বছরে দেশে ১,৮৯১ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন, যা ২০০০ সালের পর এক বছরে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৫৪ জনের। নতুন আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেক অবিবাহিত, আর বড় অংশই তরুণ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ার খবর আসছে। যে তরুণদের হাতে দেশের ভবিষ্যৎ, তারাই আজ এক নীরব ঘাতকের ঝুঁকিতে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে এইচআইভি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কেন ছড়াচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচআইভি ছড়ানোর প্রধান কারণ বিবাহবহির্ভূত ও অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, মাদকের ইনজেকশনে একই সুই ব্যবহার, আর অপরীক্ষিত রক্ত গ্রহণ। তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়া প্রমাণ করে, অবাধ মেলামেশা, পর্নোগ্রাফি আর মাদকের ছোবল আমাদের সমাজের গভীরে ঢুকে পড়েছে।
ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই এই বিপদের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।" (সূরা বনি ইসরাইল, ৩২)
লক্ষ করুন, আল্লাহ শুধু ব্যভিচার নিষেধ করেননি, এর কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ যে পথ, দৃষ্টি আর পরিবেশ মানুষকে অশ্লীলতার দিকে টেনে নেয়, সেগুলো থেকেও দূরে থাকতে বলেছেন। একইভাবে নারী-পুরুষের বৈধ বিবাহ ছাড়া সব ধরনের যৌন সম্পর্ককে, সমলিঙ্গের সম্পর্কসহ, ইসলাম স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছিলেন,
لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمُ
"কোনো জাতির মধ্যে যখন অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা প্রকাশ্যে তা করতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে মহামারি ও এমন সব রোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০১৯)
গুজব নয়, যাচাই
এমন সংবেদনশীল বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা গুজবও ছড়াচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম জুড়ে যাচাইহীন খবর ছড়ানো যেমন অন্যায়, তেমনি গুনাহও। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
"হে মুমিনগণ, কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নাও।" (সূরা হুজুরাত, ৬)
রোগীর প্রতি ঘৃণা নয়
এইচআইভি আক্রান্ত সবাই অন্যায়ের কারণে আক্রান্ত হন না। স্বামী বা স্ত্রীর মাধ্যমে, রক্ত গ্রহণে, এমনকি মায়ের গর্ভ থেকেও নিরপরাধ মানুষ আক্রান্ত হন। আর যে ভুল পথে গিয়েছিল, তার জন্যও তওবার দরজা খোলা। আমাদের ঘৃণা হবে পাপের প্রতি, পাপীর প্রতি নয়। আক্রান্তদের চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের দায়িত্ব। চিকিৎসকেরা বলছেন, নিয়মিত চিকিৎসা নিলে আক্রান্তরাও দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
আমাদের করণীয়
১. অভিভাবকেরা সন্তানের সঙ্গ, চলাফেরা ও মোবাইল ব্যবহারের প্রতি নজর রাখুন, সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো কথা বলুন।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হলে সন্তানের বিবাহ সহজ করুন। বিয়েকে কঠিন করে তুললে সমাজে অশ্লীলতার পথ সহজ হয়ে যায়।
৩. মসজিদের ইমাম ও খতিবরা খুতবায় তরুণদের চারিত্রিক পবিত্রতা, দৃষ্টির হেফাজত আর মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করুন।
৪. বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নৈতিক শিক্ষা আর সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হোক।
৫. প্রবাসী ভাইয়েরা দেশে ফেরার পর প্রয়োজনে পরীক্ষা করিয়ে নিন, পরিবারকে সুরক্ষিত রাখুন।
৬. কোনো খবর যাচাই না করে শেয়ার করবেন না।
রোগ ছড়ায় অজ্ঞতা আর অনাচারে, আর প্রতিরোধ হয় সচেতনতা আর তাকওয়ায়। আল্লাহ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সব ধরনের অশ্লীলতা ও মারাত্মক ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন। আমিন।




