সাজ্জাদ আকবর
এমফিল গবেষক, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগ, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো
(পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের প্রথম পর্ব)
ভূমিকা
সম্প্রতি মসজিদুল হারামের সীমানায় অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। কর্তৃপক্ষ শাস্তিটিকে 'তা'যির' বলে উল্লেখ করলেও পূর্ণাঙ্গ রায়, প্রমাণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো বিবরণ প্রকাশ করেনি। এই প্রবন্ধে কুরআন-সুন্নাহ, সাহাবিদের নজির, চার মাযহাবের মূলনীতি এবং মাকাসিদুশ শরিয়াহর আলোকে একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে: এই মৃত্যুদণ্ড কি আল্লাহর আইন মেনে দেওয়া হয়েছে?
১. দুটি সম্ভাব্য চিত্র ও তার ফিকহি পর্যালোচনা
এখানে আমরা ঘটনাটির দুটি চিত্র ধরে নিচ্ছি। কারণ, যথাযথ তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করেনি। ফলে তথ্যের ঘাটতি থেকে উৎসারিত সম্ভাব্য দুটি চিত্রপটেরই ফিকহি পর্যালোচনা করতে হচ্ছে।
প্রথম চিত্র: প্রাপ্তবয়স্ক, দুজন অবিবাহিত নারীপুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। তাতে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য পাওয়া গেছে অথবা তারা স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে এবং যথাযথ শরঈ প্রক্রিয়ায় তাদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এমতাবস্থায় তাদের শরঈ শাস্তি হলো:
প্রথমত, মূল অপরাধের শাস্তি: অবিবাহিত নারীপুরুষের অবৈধ মেলামেশা চারজন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণিত হলে এর জন্য ইসলাম সুনির্ধারিত শাস্তি (হদ) দিয়েছে ১০০টি করে বেত্রাঘাত। এই শাস্তি কুরআনে অকাট্যভাবে নির্ধারিত, ফলে হদের ১০০ বেত্রাঘাতের পরিমাণে কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই। (হাদিসে ১০০ বেত্রাঘাতের পাশাপাশি এক বছর দেশান্তরিত রাখার কথা যুক্ত করা হয়েছে। তবে সেটা 'হদ'-এর অংশ কিনা, তা নিয়ে ফিকহি মতভেদ আছে।)
দ্বিতীয়ত, পারিপার্শ্বিক অপরাধের শাস্তি: মসজিদুল হারামের সীমানার ভেতরে পাপকাজ করার শাস্তি কী হবে, সেটা কুরআন-সুন্নাহে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। বরং বিচারকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, পরিভাষায় যেটাকে বলে 'তা'যির'। (এক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়াহর মূলনীতি, যেটা খোদ সৌদির বিচারব্যবস্থা অনুসরণ করে, সেটি হলো— যে অপরাধের জন্য হদ নির্ধারিত আছে, তার সঙ্গে যুক্ত তা'যির কখনো সেই হদের সমান বা তার চেয়ে বেশি হতে পারবে না।)
সৌদি আদালত মূলত হাম্বলি মাযহাব অনুসরণ করে। আর হাম্বলি মাযহাবে তা'যিরের সীমা অন্য মাযহাবগুলোর চেয়েও সীমিত। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের প্রসিদ্ধ মত হলো, তা'যিরে দশ বেত্রাঘাতের বেশি দেওয়া যাবে না। তার দলিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদিস: হদ ছাড়া কোনো অবস্থায়ই বেত্রাঘাত দশটির বেশি দেওয়া যাবে না। (বুখারি ও মুসলিম) হাম্বলি মাযহাবের অন্য বর্ণনায় এর চেয়ে বেশি অনুমোদিত থাকলেও সেখানে বাড়তি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেটি হলো, যে জাতীয় পাপের একটি হদ আছে, সমজাতীয় পাপের তা'যির সেই হদ পর্যন্ত পৌঁছাবে না। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ির মতও মোটামুটি একই। মানে তা'যির হদকে অতিক্রম করবে না।
পবিত্র সময় বা স্থানে অপরাধের ক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদিনের একটি নজিরও আছে। রমজান মাসে মদ্যপানকারীকে আলী রা. মদের হদ ৮০ বেত্রাঘাত দেওয়ার পর রমজানের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য অতিরিক্ত ২০ বেত্রাঘাত দিয়েছিলেন। উমর রা. সম্পর্কেও এরকম বর্ণনা আছে (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা; সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আপত্তি রয়েছে)। তার মানে পবিত্রতা লঙ্ঘনের কারণে শাস্তির পরিমাণ বেড়েছে খানিকটা, শাস্তির ধরন বদলায়নি। বেত্রাঘাতের শাস্তি রূপ নেয়নি মৃত্যুদণ্ডে।
সুতরাং প্রথম চিত্রে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হতো হদ হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাত (সঙ্গে মতভেদপূর্ণ এক বছরের নির্বাসন), এবং পবিত্র হারাম শরীফের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য বিচারকের বিবেচনায় কিছু অতিরিক্ত তা'যির। কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ড নয়।
দ্বিতীয় চিত্র: ধরে নিই— ব্যভিচার চারজন সাক্ষী বা যথাযথ শরঈ পদ্ধতিতে প্রমাণিত হয়নি। অথবা ব্যভিচার ঘটেইনি, বরং প্রাথমিক কিছু অনৈতিক আচরণ হয়েছে। ফলে 'হদ'-এর পর্যায় থেকে সরে 'তা'যির'-এর পর্যায়ে যাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, সেই তা'যিরের মাত্রা ব্যভিচারের হদের নিচে থাকতে হবে। কারণ ফুকাহায়ে কেরামের সুস্পষ্ট উসুল হলো, ব্যভিচারের প্রাথমিক কাজ বা অপ্রমাণিত অভিযোগের শাস্তি পূর্ণ প্রমাণিত ব্যভিচারের শাস্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না।
এখানে লক্ষণীয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেই বলেছে শাস্তিটি 'তা'যির' হিসেবে দেওয়া হয়েছে, হদ হিসেবে নয়। এ থেকে বোঝা যায়, বাস্তবে দ্বিতীয় চিত্রটিই ঘটেছে। অর্থাৎ হদের প্রমাণ-শর্ত পূরণ হয়নি বা সরাসরি ব্যভিচার ঘটেইনি। অতএব যেখানে প্রমাণের দুর্বলতার কারণে ১০০ বেত্রাঘাতের হদও প্রয়োগ করা যায়নি, সেখানে তা'যিরের নামে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া শরিয়াহর যুক্তির সম্পূর্ণ উল্টো।
ইনসাফের খাতিরে উল্লেখ করা দরকার, হানাফি মাযহাব এবং হাম্বলি ফিকহের ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়িম রহ. 'সিয়াসাহ শরইয়্যাহ'-র অধীনে তা'যির হিসেবে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছেন। তবে তাদের শর্ত ছিল কঠোর। অপরাধীর ফেতনা-ফাসাদ যদি এত বেশি হয় যে, তাকে হত্যা ছাড়া অন্য কোনোভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব না, সেক্ষেত্রে সর্বশেষ উপায় হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে অনুমোদন করা হয়েছে। যেমন শত্রুপক্ষের গুপ্তচরবৃত্তি, বারবার ভয়ংকর অপরাধে জড়ানো, কিংবা সমাজে বিভেদ-নৈরাজ্য আর ত্রাস সৃষ্টিকারী কিংবা মাদক-নেশা দিয়ে সমাজকে অস্থিরতা ও ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তি। একবারের ঘটনায়, তিন বছরের বেশি কারাভোগ করা দুজন দরিদ্র শ্রমিকের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনটা পাওয়া গেল? সেই তথ্য তো সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করতে পারল না।
ফলাফল: দুই চিত্রের কোনোটিতেই, এমনকি সৌদি আরবের অনুসৃত হাম্বলি মাযহাবের মানদণ্ডেও, এই মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে স্পষ্ট শরঈ ভিত্তি আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।
পরবর্তী পর্বে: এই মৃত্যুদণ্ডে কি মাকাসিদুশ শরিয়াহ লঙ্ঘন হয়েছে?




