সাজ্জাদ আকবর

এমফিল গবেষক, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগ, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো

(পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের পঞ্চম ও শেষ পর্ব। আগের পর্বে দণ্ডিত ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার এবং বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।)

গ) ওয়ালিউল আমরের ক্ষমতার সীমা

সৌদি কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য সবচেয়ে শক্ত যুক্তি হলো, তা'যির ও 'সিয়াসাহ শরইয়্যাহ' শাসককে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়। এতে আপত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন থাকে— এই ক্ষমতা কি সীমাহীন? ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় শাসকের ক্ষমতাকে তুলনা করা হয়েছে এতিমের অভিভাবকের সঙ্গে। উমর রা. বলেছিলেন, আমি নিজেকে আল্লাহর সম্পদের ক্ষেত্রে এতিমের অভিভাবকের স্থানে রেখেছি। এতিমের অভিভাবক তার সম্পদ খরচ করতে পারেন, তবে কেবল এতিমের কল্যাণে, নিজের ইচ্ছামতো নয়। ঠিক তেমনি শাসকের বিবেচনার ক্ষমতাও মানুষের কল্যাণের সঙ্গে বাঁধা। ফকিহরা এই নীতিকে একটি মৌলিক সূত্রে প্রকাশ করেছেন— জনগণের ওপর শাসকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কল্যাণকর হওয়ার শর্তে বৈধ। যে সিদ্ধান্তে কল্যাণ নেই, তা শাসকের এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে না।

সিয়াসাহ শরইয়্যাহর অন্যতম প্রধান ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. নিজেই এর মাপকাঠি দিয়েছেন। তিনি ইবনে আকিল রহ.-এর সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছেন: সিয়াসাহ হলো এমন পদক্ষেপ, যার ফলে মানুষ কল্যাণের অধিক নিকটবর্তী এবং ফাসাদ থেকে অধিক দূরে থাকে। তিনি আরও বলেছেন, যে পথে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা দীনেরই অংশ। অর্থাৎ সিয়াসাহর বৈধতার মানদণ্ড ন্যায় ও কল্যাণ, শাসকের ইচ্ছা নয়।

এই মানদণ্ডে প্রশ্ন দাঁড়ায়: তিন বছরের বেশি কারাভোগ করা দুজন দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিককে, অপ্রকাশিত প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিবার ও রাষ্ট্রকে না জানিয়ে, হদের চেয়েও কঠোর শাস্তি দেওয়ায় সমাজ কোন কল্যাণের নিকটবর্তী হলো? কোন ফাসাদ দূর হলো? যে সিয়াসাহ ন্যায় প্রতিষ্ঠার বদলে বিশ্বজুড়ে ইসলামি আইন নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করে, তা ইবনুল কাইয়িমের নিজের মানদণ্ডেও ন্যায়ভিত্তিক সিয়াসাহ বা 'সিয়াসাহ আদিলাহ'-র সংজ্ঞায় পড়ে না।

উপসংহার

এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য অপরাধকে হালকা করা নয়; পবিত্র হারামে এমন কাজ নিঃসন্দেহে গুরুতর পাপ। প্রশ্নটি শাস্তির মাত্রা ও পদ্ধতি নিয়ে। অপরাধ প্রমাণিত হোক বা না হোক— দুই চিত্রেই শরিয়াহর সর্বোচ্চ সীমা ছিল ব্যভিচারের হদ ও তার আনুপাতিক তা'যির। ইবনে আব্বাস রা.-এর নীতি, নবীযুগের নজির, আলী রা.-এর আমল এবং শায়খ ইবনে বায রহ.-এর বক্তব্য— সবই একই দিকে ইঙ্গিত করে: হারামের মর্যাদা লঙ্ঘন শাস্তিকে কিছুটা বাড়াতে পারে, কিন্তু তার ধরন বদলে মৃত্যুদণ্ডে পরিণত করে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপ্রকাশিত প্রমাণ, গোপন বিচার এবং দণ্ডিতের পরিবারকে অন্ধকারে রাখা, যা ইসলামি বিচারনীতির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চেতনার পরিপন্থী। শরিয়াহর মূলনীতি হলো, সন্দেহ থাকলে হদ রহিত হয়ে যায়; সেখানে সন্দেহের ওপর দাঁড়িয়ে প্রাণদণ্ড দেওয়া ইসলামি আইনের মর্মবাণীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, তারা এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় ও প্রমাণ প্রকাশ করুক, যাতে উম্মাহর আলেম ও গবেষকরা যাচাই করতে পারেন যে আল্লাহর বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়েছে কিনা।