সাজ্জাদ আকবর
এমফিল গবেষক, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগ, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো
(পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের তৃতীয় পর্ব। আগের পর্বে মাকাসিদুশ শরিয়াহর আলোকে রায়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।)
৩. মক্কার ভেতরে অপরাধ: ইসলামি ঐতিহ্যে বিচারের যেসব নজির পাওয়া যায়
ক) ইবনে আব্বাস রা.-এর অনুসৃত নীতি: তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি হারাম শরীফের ভেতরে অপরাধ করে, তার ওপর সেই অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে, যে অপরাধ সে করেছে (আযরাকি, আখবারু মাক্কা; তাহাবি, শারহু মুশকিলিল আসার; সনদ সহিহ)। অর্থাৎ হারামে অপরাধ করলেও শাস্তি হবে সেই অপরাধের নির্ধারিত শাস্তি, ভিন্ন বা বর্ধিত কোনো শাস্তি নয়।
খ) নবীযুগে মক্কা বিজয়ের সময় চুরির ঘটনা: মাখযুমি গোত্রের এক নারী মক্কার সীমানার ভেতরে চুরি করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ওপর চুরির নির্ধারিত হদই প্রয়োগ করেন। এমনকি উসামা রা.-এর সুপারিশও নবীজি আমলে নেননি (বুখারি ও মুসলিম)। এই ঘটনায় হারামের সীমানায় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত হদ (হাত কাটা) প্রয়োগ করা হয়েছে; হারামের সম্মানার্থে শাস্তি বাড়ানো হয়নি।
গ) আলী রা.-এর নজির: স্থান হিসেবে হারাম বা মক্কা নগরীর যেমন মর্যাদা আছে, তেমনি পবিত্র সময় হিসেবে রমজান মাসেরও আছে বিশেষ মর্যাদা। কবি নাজাশিকে রমজান মাসে মদপানের অপরাধে আলী রা.-এর কাছে আনা হলে তিনি প্রথমে তাকে মদের নির্ধারিত হদ হিসেবে ৮০টি বেত্রাঘাত করেন। পরদিন আরও ২০টি বেত্রাঘাত করেন। নাজাশি কারণ জানতে চাইলে আলী রা. বলেন, এই বিশটি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার দুঃসাহস এবং রমজানের মর্যাদা লঙ্ঘনের জন্য। উমর রা. সম্পর্কেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ৩০৬০০–৩০৬০১; সনদে বিচ্ছিন্নতার আপত্তি রয়েছে, তবে একাধিক সূত্রে বর্ণিত)।
এই নজির থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, পবিত্র সময় বা স্থানের লঙ্ঘনকে সাহাবিরা অপরাধের গুরুত্ব বৃদ্ধির কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন। দুই, সেই বৃদ্ধির প্রকাশ ঘটেছে মূল হদ অক্ষুণ্ণ রেখে তার সঙ্গে আলাদা তা'যির যোগ করার মাধ্যমে। তিন, অতিরিক্ত অংশটি ছিল মূল শাস্তির এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ শাস্তি মাত্রায় কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তার ধরন বদলায়নি। বেত্রাঘাতের শাস্তি কখনো মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হয়নি। এই মাপকাঠিতে হারামের ভেতরে অবিবাহিতের ব্যভিচারের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো হদের ১০০ বেত্রাঘাতের সঙ্গে আনুপাতিক কিছু তা'যির, মৃত্যুদণ্ড কখনোই নয়।
ঘ) সৌদি আরবেরই সাবেক গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্য: শায়খ আবদুল আযিয ইবনে বায রহ. বলেছেন, যে হারামের ভেতরে ব্যভিচারের মাধ্যমে হারামের মর্যাদা লঙ্ঘন করে, তার ওপর তার হদ প্রয়োগ করা হবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় চোর নারীর হাত কেটেছিলেন। লক্ষণীয় যে, সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধানও হারামে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে ব্যভিচারের হদকেই উল্লেখ করেছেন, বাড়িয়ে দেওয়া নতুন কোনো শাস্তির কথা বলেননি।
ঙ) কুরআনের হুঁশিয়ারির ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলা বলেছেন— 'আর যে ব্যক্তি সেখানে (মসজিদুল হারামে) অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘনের ইচ্ছা করে, তাকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাব।' (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:২৫) মুফাসসিররা ব্যাখ্যা করেছেন, হারামে পাপের গুরুত্ব বেশি; এমনকি হারামে কেউ শুধু পাপের নিয়ত করলে সেই নিয়তের জন্যও তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তবে এই জবাবদিহি মূলত আল্লাহর কাছে, আখেরাতের সাথে সম্পর্কিত। আয়াতের অর্থ এই নয় যে, দুনিয়াবি আদালতে হদ পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে।
৪. বিচারকার্যের শরঈ প্রসিডিওর: কতটা রক্ষিত হলো, কতটা লঙ্ঘিত হলো?
এই মামলায় সৌদি কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ রায়, বিচারিক যুক্তি, উপস্থাপিত প্রমাণ কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো বিবরণই প্রকাশ করেনি। ফলে অভিযুক্তরা আইনজীবী বা দোভাষী পেয়েছিলেন কিনা, আপিলে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পেরেছিলেন কিনা— এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। হতে পারে এর সবই যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছিল। তাই এই লেখায় আমরা দাবি করছি না যে এগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে: এসব বিষয় গোপন রাখা কি খোদ ইসলামি বিচারনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? কারণ মৃত্যুদণ্ড এমন শাস্তি, যা একবার কার্যকর হলে আর ফেরানো যায় না। তাই কার্যকর করা দণ্ডের যৌক্তিকতা ও প্রমাণের স্বচ্ছতা দেখানোর দায় দণ্ডদাতা রাষ্ট্রের। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— শাসকের ভুলক্রমে ক্ষমা করে দেওয়া, ভুলক্রমে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তম। এই হাদিসের অন্তর্নিহিত বার্তা স্পষ্ট: শরিয়াহর মানশা মানুষের জীবন বাঁচানো, পাশাপাশি তা'যিরের মাধ্যমে অপরাধ দমন করা।
পরবর্তী পর্বে: দণ্ডিত ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার এবং বিচারের স্বচ্ছতা




