ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৭): কুরআন শুনে বদলে যাওয়া হৃদয়

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

পর্ব ১৫-এ আমরা কুরআনের ভাষার সৌন্দর্য দেখেছি। কিন্তু সৌন্দর্য শুধু মুগ্ধ করে, জীবন বদলায় না। কুরআনের বিস্ময় হলো, এটি শুধু কানে মধু ঢালে না, হৃদয়ের ভেতরে প্রবেশ করে মানুষকে আমূল বদলে দেয়। আজ আমরা এমন কয়েকজন মানুষের কথা জানব, যাঁদের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল কুরআনের কয়েকটি আয়াত শুনে।

কুরআন নিজেই তার এই প্রভাবের কথা বলেছে, "আল্লাহ নাযিল করেছেন সর্বোত্তম বাণী... এতে তাদের গায়ের চামড়া শিহরিত হয়, যারা তাদের রবকে ভয় করে। তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে কোমল হয়ে যায়।" (সূরা যুমার ৩৯:২৩)

১. কানে তুলা গোঁজা কবি

তুফাইল ইবনে আমর দাওসি ছিলেন দাওস গোত্রের নেতা ও বিখ্যাত কবি। তিনি মক্কায় এলে কুরাইশ নেতারা তাঁকে ঘিরে ধরল। বলল, এই লোকটির (নবীজির) কথা শুনবেন না, তার কথায় যাদু আছে, পরিবারে বিভেদ সৃষ্টি করে। তারা এত বেশি ভয় দেখাল যে, তুফাইল কাবায় যাওয়ার সময় কানে তুলা গুঁজে নিলেন, যাতে একটি শব্দও কানে না ঢোকে।

কিন্তু কাবার কাছে নবীজি নামাজে তেলাওয়াত করছিলেন, আর তুলার ফাঁক দিয়েও কিছু শব্দ কানে পৌঁছে গেল। তুফাইল মনে মনে বললেন, আমি একজন বুদ্ধিমান কবি, ভালো-মন্দ চিনি। শুনে দেখি না কেন? যদি ভালো হয়, গ্রহণ করব, মন্দ হলে ছেড়ে দেব। তিনি তুলা খুলে ফেললেন, নবীজির ঘর পর্যন্ত তাঁর পিছু নিলেন, কুরআন শুনলেন এবং সেখানেই ঈমান আনলেন। পরে নিজ গোত্রে ফিরে দাওয়াত দিলেন, আর ধীরে ধীরে পুরো দাওস গোত্র মুসলমান হয়ে গেল। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

যে কুরআন থেকে মানুষকে দূরে রাখতে শত্রুরা এত চেষ্টা করেছে, তুলার ফাঁক দিয়ে আসা কয়েকটি শব্দই সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে।

২. বর্শা হাতে আসা দুই নেতা

হিজরতের আগে নবীজি মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় দাওয়াতের জন্য পাঠান। মদিনার আবদুল আশহাল গোত্রের নেতা উসাইদ ইবনে হুদাইর খবর পেয়ে বর্শা হাতে রেগে এলেন। বললেন, তোমরা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে এসেছ? প্রাণে বাঁচতে চাইলে এখান থেকে চলে যাও।

মুসআব (রা.) শান্তভাবে বললেন, একটু বসে শুনবেন? পছন্দ হলে গ্রহণ করবেন, অপছন্দ হলে আমরা চলে যাব। উসাইদ বর্শা মাটিতে গেঁথে বসলেন। মুসআব (রা.) কুরআন তেলাওয়াত করলেন। বর্ণনাকারীরা বলেন, কথা বলার আগেই উসাইদের চেহারায় ইসলামের দীপ্তি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, কত সুন্দর এই বাণী! এই দ্বীনে প্রবেশ করতে কী করতে হয়?

এরপর তিনি গোত্রের প্রধান নেতা সাদ ইবনে মুআজকে পাঠালেন। সাদও রেগে এলেন, আর একইভাবে কুরআন শুনে ঈমান আনলেন। তারপর তিনি নিজ গোত্রকে বললেন, তোমরা আমাকে কেমন মনে করো? তারা বলল, আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিচক্ষণ। তিনি বললেন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমাদের নারী-পুরুষ কারো সাথে আমি কথা বলব না। সেদিন সন্ধ্যার আগেই আবদুল আশহাল গোত্রের সবাই মুসলমান হয়ে গেল। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

একটি গোত্রের নেতারা সকালে এসেছিলেন বর্শা হাতে, আর সন্ধ্যায় পুরো গোত্র ঈমান এনেছিল। এর মাঝে ছিল শুধু কুরআনের কয়েকটি আয়াত।

৩. দেয়াল টপকানো ডাকাত

ফুদাইল ইবনে ইয়াদ (রহ.) যৌবনে ছিলেন ডাকাত। এক রাতে তিনি একটি অন্যায় উদ্দেশ্যে দেয়াল টপকাচ্ছিলেন। তখন কোথাও কেউ তেলাওয়াত করছিল, "যারা ঈমান এনেছে, তাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হওয়ার সময় কি এখনো আসেনি?" (সূরা হাদিদ ৫৭:১৬)

আয়াতটি শুনে ফুদাইল দেয়ালের ওপরেই থমকে গেলেন। বললেন, "হ্যাঁ, হে আমার রব, সময় এসে গেছে।" সেই রাতেই তিনি তওবা করলেন। (ইমাম যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা)

যে মানুষটি রাতের পথিকদের আতঙ্ক ছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে হয়ে উঠলেন মক্কার হারামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবেদ ও হাদিসের ইমাম, যাঁর কাছে ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতো মনীষীরাও শিখতে এসেছেন। একটি আয়াত একজন ডাকাতকে একজন ইমামে রূপান্তরিত করেছিল।

৪. জিনেরাও শুনেছিল

কুরআনের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, "বলুন, আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তারপর তারা বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করে। তাই আমরা এতে ঈমান এনেছি।" (সূরা জিন ৭২:১-২)

সূরা আহকাফে আছে, জিনেরা কুরআন শুনে নিজেদের জাতির কাছে ফিরে গিয়ে সতর্ককারী হিসেবে দাওয়াত দিয়েছিল। (সূরা আহকাফ ৪৬:২৯-৩১)

৫. খ্রিস্টানদের অশ্রু

আল্লাহ তাআলা একদল খ্রিস্টানের কথা বলেছেন, "রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা যখন তারা শোনে, তুমি দেখবে, সত্যকে চিনতে পারার কারণে তাদের চোখ অশ্রুতে উপচে পড়ছে। তারা বলে, হে আমাদের রব, আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।" (সূরা মায়িদা ৫:৮৩)

মুফাসসিরগণ বলেছেন, এই আয়াত হাবশার বাদশাহ নাজাশি ও তাঁর দরবারের খ্রিস্টান আলেমদের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে, যাঁরা কুরআন শুনে কেঁদেছিলেন। পর্ব ১৩-এ আমরা তাঁর ঘটনা দেখেছি।

৬. যাঁর ওপর নাযিল হয়েছে, তিনিও কাঁদতেন

একবার নবীজি (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বললেন, আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও। ইবনে মাসউদ (রা.) বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনাকে পড়ে শোনাব, অথচ আপনার ওপরই তো তা নাযিল হয়েছে? নবীজি বললেন, আমি অন্যের কাছ থেকে শুনতে ভালোবাসি। তিনি সূরা নিসা পড়তে শুরু করলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন, "তখন কী অবস্থা হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব, আর আপনাকে আনব এদের ওপর সাক্ষী হিসেবে?" (সূরা নিসা ৪:৪১), নবীজি বললেন, যথেষ্ট। ইবনে মাসউদ (রা.) তাকিয়ে দেখলেন, নবীজির দুচোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। (সহিহ বুখারি)

এটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। কোনো লেখক নিজের লেখা অন্যের মুখে শুনে কাঁদে না। নবীজি কুরআন শুনে কাঁদতেন, কারণ তিনি জানতেন, এটি তাঁর নিজের কথা নয়, তাঁর রবের বাণী।

৭. আমাদের যুগেও

এই রূপান্তর শুধু ইতিহাসের গল্প নয়। আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য মানুষ, যাঁদের অনেকে আরবি জানেন না, কুরআনের অনুবাদ পড়ে বা তেলাওয়াত শুনে ইসলাম গ্রহণ করছেন। যেমন বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী ক্যাট স্টিভেন্স, যিনি পরে ইউসুফ ইসলাম নাম গ্রহণ করেন, নিজেই বলেছেন, ভাইয়ের উপহার দেওয়া কুরআনের একটি কপি পড়েই তাঁর জীবন বদলে গিয়েছিল।

কেন এটি প্রমাণ?

মানুষের লেখা বাণীর প্রভাব সময়ের সাথে ফিকে হয়ে যায়। কোনো বিখ্যাত কবির কবিতা তার যুগে মানুষকে নাড়া দেয়, কিন্তু কয়েক প্রজন্ম পর তা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় হয়ে যায়। অনুবাদে তো তার জাদু আরও হারিয়ে যায়। অথচ কুরআন চৌদ্দশ বছর পরেও, ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন সংস্কৃতিতে, এমনকি অনুবাদের মাধ্যমেও, একইভাবে মানুষের হৃদয় বদলে দিচ্ছে। কবি থেকে ডাকাত, গোত্রনেতা থেকে আধুনিক সংগীতশিল্পী, সবার হৃদয়ের তালা খুলেছে একই চাবি।

এর কারণ, কুরআন সেই সত্তার বাণী, যিনি মানুষের হৃদয় সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন, কোন কথা হৃদয়ের কোন দরজায় পৌঁছায়।

উপসংহার

আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি আমি এই কুরআন কোনো পাহাড়ের ওপর নাযিল করতাম, তবে তুমি দেখতে, তা আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।" (সূরা হাশর ৫৯:২১) যে বাণীর সামনে পাহাড়ও নত হয়ে যেত, তা মানুষের হৃদয় বদলে দেবে, এতে আর বিস্ময় কী? প্রশ্ন শুধু একটাই: আমরা কি সেই বাণী শোনার জন্য হৃদয়ের দরজা খুলে দিচ্ছি?

আগের পর্ব (পর্ব ১৬): কুরআন মুখস্থ করা এত সহজ কেন?

লিংক https://dawah24.com/bn/news/100-proofs-that-islam-is-true-part-16-why-is-the-quran-so-easy-to-memorize

আগামী পর্বে থাকছে: মাতৃগর্ভে মানব সৃষ্টির ধাপ। ইনশাআল্লাহ।