ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৯): সৃষ্টির সূচনা ও বিস্তৃত মহাবিশ্ব
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
পর্ব ১৮-এ আমরা মাতৃগর্ভের ক্ষুদ্র জগৎ দেখেছি। আজ তাকাব বিশাল মহাবিশ্বের দিকে। আগের পর্বের মতো এখানেও আমাদের নীতি একই: আয়াতকে টেনে বিজ্ঞানের সাথে মেলাব না। বিজ্ঞানের তত্ত্ব সময়ের সাথে বদলাতে পারে, কুরআন বদলায় না। আমরা শুধু দেখব, কুরআন যা বলেছে, আর আজকের বিজ্ঞান যা প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে জানে, তার মধ্যে কোনো বিরোধ আছে কি না।
মহাবিশ্বের কি শুরু আছে?
এটি মানবচিন্তার সবচেয়ে পুরনো প্রশ্নগুলোর একটি। প্রাচীন গ্রিসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, মহাবিশ্ব অনাদি ও চিরন্তন, এর কোনো শুরু নেই, শেষও নেই। তাঁর এই মত হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে দর্শনের জগতে প্রভাব বিস্তার করেছে।
এমনকি বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করতেন, মহাবিশ্ব মোটামুটি স্থির ও অপরিবর্তনীয়। আলবার্ট আইনস্টাইন যখন তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণে দেখলেন যে মহাবিশ্ব স্থির থাকতে পারে না, তখন তিনি মহাবিশ্বকে স্থির দেখানোর জন্য সমীকরণে একটি অতিরিক্ত রাশি যোগ করেছিলেন। পরে প্রমাণের মুখে তিনি সেই অবস্থান ছেড়ে দেন।
কুরআনের অবস্থান
অথচ কুরআন শুরু থেকেই স্পষ্ট: মহাবিশ্ব অনাদি নয়, আল্লাহ একে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তিনি আসমানসমূহ ও জমিনের উদ্ভাবক।" (সূরা বাকারা ২:১১৭) আরবি "বাদী" শব্দের অর্থ এমন স্রষ্টা, যিনি পূর্বের কোনো নমুনা ছাড়াই, শূন্য থেকে সৃষ্টি করেন।
কুরআন শুধু সূচনার কথাই বলেনি, সমাপ্তির কথাও বলেছে, "সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে লিখিত কাগজের পাতা গুটিয়ে রাখা হয়। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই আবার তা ফিরিয়ে আনব।" (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৪)
মিলিত ছিল, তারপর আলাদা
আল্লাহ তাআলা বলেন, "যারা কুফরি করে, তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও জমিন একসাথে মিলিত (রাতক) ছিল, তারপর আমি উভয়কে আলাদা (ফাতক) করে দিয়েছি?" (সূরা আম্বিয়া ২১:৩০)
আরবি "রাতক" অর্থ জোড়া লাগানো, একসাথে মিশে থাকা। আর "ফাতক" অর্থ ছিঁড়ে আলাদা করা। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ প্রাচীন মুফাসসিরগণও বলেছেন, আসমান ও জমিন শুরুতে একসাথে মিলিত ছিল, পরে আল্লাহ এদের আলাদা করেছেন।
আজকের বিজ্ঞানের সর্বাধিক গৃহীত মডেল বলে, প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের সব পদার্থ ও শক্তি একটি অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত অবস্থায় একত্রিত ছিল। সেখান থেকে মহাবিশ্বের বিস্তার শুরু হয়, আর ক্রমে আলাদা আলাদা নক্ষত্র, ছায়াপথ ও গ্রহ তৈরি হয়। একে সাধারণত "বিগ ব্যাং" বলা হয়। আমরা দাবি করছি না যে আয়াতটি এই মডেলের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। কিন্তু "সবকিছু একসাথে মিলিত ছিল, তারপর আলাদা করা হয়েছে", এই মৌলিক চিত্রের সাথে আজকের বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই, বরং সামঞ্জস্য আছে।
আকাশ ছিল ধোঁয়া
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, "তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন তা ছিল ধোঁয়া (দুখান)।" (সূরা হা-মীম সাজদা ৪১:১১)
বিজ্ঞানীরা বলেন, নক্ষত্র ও ছায়াপথ তৈরির আগে মহাবিশ্ব ভরা ছিল উত্তপ্ত গ্যাস ও ধূলিকণায়। আজও নতুন নক্ষত্র জন্ম নেয় গ্যাস আর ধূলির বিশাল মেঘ থেকে, যাকে বলা হয় নীহারিকা। অনেকে কুরআনের "ধোঁয়া" শব্দের মধ্যে এই অবস্থার একটি সুন্দর ও সহজবোধ্য বর্ণনা দেখেন। ধোঁয়া মানে কঠিন নয়, তরলও নয়, বরং গ্যাস ও কণার মিশ্রণ।
আকাশকে প্রশস্ত করা হচ্ছে
সবচেয়ে বিস্ময়কর আয়াতটি হলো এটি: "আকাশ, আমি তা নির্মাণ করেছি শক্তি দিয়ে, আর নিশ্চয়ই আমি সম্প্রসারণকারী (লামূসিঊন)।" (সূরা যারিয়াত ৫১:৪৭)
ন্যায্যতার খাতিরে বলা দরকার, প্রাচীন মুফাসসিরগণ "লামূসিঊন" শব্দের কয়েকটি অর্থ বলেছেন: "আমি প্রশস্ত ক্ষমতার অধিকারী", "আমি রিযিক প্রশস্তকারী", আবার কেউ কেউ বলেছেন "আমি আকাশকে প্রশস্তকারী"। আরবি ভাষায় শব্দটি "আওসাআ" থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রশস্ত করা, বিস্তৃত করা। আর এটি এসেছে কর্তাবাচক বিশেষ্য রূপে, যা চলমান ও স্থায়ী কাজ বোঝায়।
এবার আধুনিক বিজ্ঞানের দিকে তাকাই। ১৯২০-এর দশকে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী জর্জ লেমেত্র তাত্ত্বিকভাবে দেখান যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। ১৯২৯ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণ করে দেখান, দূরের ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আর যত দূরে, তত দ্রুত। অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। পরে ১৯৬৫ সালে মহাবিশ্বের সূচনাকালের রেখে যাওয়া বিকিরণ (কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড) আবিষ্কৃত হয়, যা মহাবিশ্বের একটি সূচনা থাকার পক্ষে বড় প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
চৌদ্দশ বছর আগে যখন মানুষ আকাশকে একটি স্থির ছাদ মনে করত, তখন কুরআন এমন শব্দ ব্যবহার করেছে, যার আভিধানিক অর্থ "আমি প্রশস্তকারী", আর যা আজকের আবিষ্কারের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
কেন এটি প্রমাণ?
প্রথমত, কুরআন এমন যুগে মহাবিশ্বের সূচনার কথা দৃঢ়ভাবে বলেছে, যখন বিশ্বের প্রভাবশালী দর্শন মহাবিশ্বকে অনাদি মনে করত। যদি কুরআন মানুষের রচনা হতো এবং সেই যুগের জ্ঞানী মহলের প্রভাব নিত, তবে এই প্রশ্নে অন্তত দ্বিধা থাকত। অথচ কুরআনের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট, আর বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান সেই অবস্থানের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কুরআন মহাবিশ্ব সম্পর্কে যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছে, মিলিত থাকা ও আলাদা হওয়া, ধোঁয়া, প্রশস্ত করা, সেগুলোর কোনোটিই আজকের বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। সপ্তম শতাব্দীর কোনো মানুষের পক্ষে মহাবিশ্ব নিয়ে এতগুলো কথা বলে একটিও ভুল না করা অসম্ভব।
তৃতীয়ত, মহাবিশ্বের সূচনা থাকা মানেই একজন সূচনাকারী থাকা। যা কিছুর শুরু আছে, তার পেছনে একটি কারণ থাকতে হয়। যে বিজ্ঞান একসময় স্রষ্টার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে অনাদি মহাবিশ্বের ধারণা আঁকড়ে ধরেছিল, সেই বিজ্ঞানই আজ মহাবিশ্বের সূচনার সাক্ষ্য দিচ্ছে। (এই যুক্তি আমরা বিস্তারিত দেখব পর্ব ৪৬-এ, "স্রষ্টার অস্তিত্ব" আলোচনায়।)
উপসংহার
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি অচিরেই তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাব দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটাই সত্য।" (সূরা হা-মীম সাজদা ৪১:৫৩) গত পর্বে আমরা দেখেছি মানুষের নিজের মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন, আর আজ দেখলাম দিগন্তে, মহাবিশ্বের বিশালতায়। ক্ষুদ্রতম ভ্রূণ থেকে বিশালতম ছায়াপথ, সবই সাক্ষ্য দেয় এক মহান স্রষ্টার, আর সাক্ষ্য দেয় সেই কিতাবের সত্যতার, যা তাঁর পক্ষ থেকে এসেছে।
আগের পর্ব (পর্ব ১৮): মাতৃগর্ভে মানব সৃষ্টির ধাপ
আগামী পর্বে থাকছে: পানি থেকে সকল প্রাণ। ইনশাআল্লাহ।




