মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
চৌদ্দশ বছর আগে মক্কার এক গুহায় যে আলো জ্বলে উঠেছিল, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। সাহারার মরুভূমি থেকে সাইবেরিয়ার তুষারপ্রান্তর, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ থেকে আমেরিকার শহর, সবখানেই আজ আজানের ধ্বনি শোনা যায়। পৃথিবীর প্রতি চারজন মানুষের একজন আজ মুসলিম। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত প্রসারমান ধর্ম ইসলাম।
একজন মানুষ থেকে দুশো কোটি
মক্কায় যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দাওয়াত দিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন। খাদিজা, আবু বকর, আলী, যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুম। কুরাইশরা ঠাট্টা করত, নির্যাতন করত, বয়কট করত। কেউ কল্পনাও করেনি, এই ছোট্ট কাফেলা একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীর একটিতে পরিণত হবে।
কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কঠিন দিনগুলোতেই সুসংবাদ দিয়েছিলেন,
لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ هَذَا الدِّينَ
"দিন ও রাত যতদূর পৌঁছায়, এই দ্বীনও ততদূর পৌঁছাবে। মাটির ঘর হোক বা পশমের তাঁবু, আল্লাহ এমন কোনো ঘর বাকি রাখবেন না, যেখানে এই দ্বীন প্রবেশ করাবেন না।" (মুসনাদে আহমদ)
আজ আমরা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন চোখের সামনে দেখছি।
তলোয়ার নয়, চরিত্র
ইসলামের সমালোচকরা প্রায়ই বলেন, ইসলাম তলোয়ারের জোরে ছড়িয়েছে। অথচ ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়া, সেখানে কোনো মুসলিম সেনাবাহিনী কখনো যায়নি। গিয়েছিলেন আরব ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের সততা, ওজনে ঠিক দেওয়া, প্রতিশ্রুতি রক্ষা আর নামাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে স্থানীয় মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
আমাদের বাংলাদেশেও ইসলাম এসেছে সুফি সাধক আর আলেমদের হাত ধরে। শাহজালাল, খান জাহান আলী, শাহ মখদুম রহিমাহুমুল্লাহর মতো মনীষীরা ভালোবাসা আর মানবসেবা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। জাতপাতের বিভেদে পিষ্ট মানুষ ইসলামে খুঁজে পেয়েছিল মর্যাদা, যেখানে রাজা আর প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে।
আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
"দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।" (সূরা বাকারা, ২৫৬)
কেন মানুষ ইসলামের দিকে ফিরছে
আধুনিক পৃথিবী মানুষকে প্রযুক্তি দিয়েছে, আরাম দিয়েছে, কিন্তু প্রশান্তি দিতে পারেনি। প্রাচুর্যের মাঝেও মানুষ একাকী, হতাশ, অস্থির। এই শূন্যতায় ইসলাম মানুষকে দেয় জীবনের অর্থ। কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কোথায় যাব, এই চিরন্তন প্রশ্নের সহজ ও যৌক্তিক উত্তর।
ইসলামের সৌন্দর্য তার সরলতায়। এক আল্লাহ, এক রাসুল, এক কিতাব। কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই, পুরোহিত নেই। বান্দা সরাসরি তার রবের সাথে কথা বলে, দিনে পাঁচবার। আল্লাহ বলেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
"জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।" (সূরা রা'দ, ২৮)
কুরআন মানুষকে মুগ্ধ করে তার অলৌকিক ভাষায়, আর এই সত্যে যে চৌদ্দশ বছরেও এর একটি অক্ষর বদলায়নি। লাখো মানুষের বুকে তা সংরক্ষিত, পৃথিবীর কোনো গ্রন্থের এমন সৌভাগ্য হয়নি।
ইসলাম মানুষকে দেয় ভ্রাতৃত্ব। হজের মাঠে কালো-সাদা, ধনী-গরিব, আরব-অনারব সবাই এক কাপড়ে, এক কাতারে। প্রবাসে যে মুসলিম ভাইকে আগে কখনো দেখিনি, মসজিদে দেখা হলেই সে আপন হয়ে যায়।
কোরিয়ার মাটিতে আজানের ধ্বনি
এই প্রসারের সাক্ষী আমরা নিজেরাই। কয়েক দশক আগেও দক্ষিণ কোরিয়ায় মসজিদ ছিল হাতেগোনা। আজ দেশজুড়ে মসজিদ ও নামাজের স্থান ছড়িয়ে আছে। শুধু আনসান শহরেই প্রায় ৩০ হাজার মুসলিমের বসবাস। প্রতি সপ্তাহে আমাদের মসজিদে কোরিয়ান অতিথিরা আসেন, ইসলাম সম্পর্কে জানতে চান। তাদের অনেকেই কুরআনের অনুবাদ হাতে নিয়ে ফিরে যান, কেউ কেউ কালেমা পড়ে আমাদের ভাই হয়ে যান। প্রতিটি নতুন মুসলিম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর নূর কোনো সীমানা মানে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
"তারা ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করবেনই, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।" (সূরা সফ, ৮)
সংখ্যা নয়, মান
তবে এই প্রসার নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছিলেন, এমন সময় আসবে যখন মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক হবে, কিন্তু হবে বন্যার ফেনার মতো, হালকা ও শক্তিহীন। (সুনানে আবু দাউদ)
তাই প্রশ্ন শুধু আমরা কতজন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন মুসলিম। আমাদের চরিত্র কি সেই ব্যবসায়ীদের মতো, যাদের দেখে একটি পুরো জাতি ইসলাম গ্রহণ করেছিল? আমাদের কর্মস্থলে, প্রতিবেশীর সাথে, রাস্তায়, অফিসে কি আমরা ইসলামের জীবন্ত দাওয়াত?
প্রবাসে আমরা প্রত্যেকেই একজন দূত। একজন কোরিয়ান সহকর্মী হয়তো কোনোদিন কুরআন পড়বেন না, কিন্তু আমাদের সততা, আমাদের হাসিমুখ, আমাদের নামাজের নিষ্ঠা তিনি প্রতিদিন দেখছেন। আমাদের আচরণই হয়তো তার জীবনে পড়া প্রথম ও একমাত্র ইসলামের কিতাব।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
"তার কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি তো মুসলিমদের একজন।" (সূরা হা-মীম সাজদা, ৩৩)
ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছে আল্লাহর ইচ্ছায়। আমাদের কাজ শুধু সেই আলোর বাহক হওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দ্বীনের যোগ্য দাঈ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।





