글하디스

চুসক ও ঈদ

চুসকের ছুটি শুরু হয়েছে। ছুটি মানেই আনন্দ, পরিবার, বিশ্রাম ও মিলন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কী উপলক্ষে ছুটি, সেটা আমাদের জানতে হবে। কারণ সব ছুটি একইভাবে উদযাপন করা যায় না।

게시일 2026년 9월 24일3분 읽기
চুসক ও ঈদ — 사진 1 / 1

| মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান |

চুসকের ছুটি শুরু হয়েছে। ছুটি মানেই আনন্দ, পরিবার, বিশ্রাম ও মিলন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কী উপলক্ষে ছুটি, সেটা আমাদের জানতে হবে। কারণ সব ছুটি একইভাবে উদযাপন করা যায় না।

কোরিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী দুটি বড় উৎসব হলো সলনাল (설날) ও চুসক (추석)। সলনাল চান্দ্র নববর্ষের উৎসব, আর চুসক শরৎকালীন বড় উৎসব। অনেকটা আমাদের দুই ঈদের মতো বড় সামাজিক পরিসর তৈরি করে।

দুঃখজনকভাবে, কিছু মুসলিম ভাই-বোন এসব উৎসবে কোরিয়ানদের সঙ্গে আনন্দে যোগ দেন এবং কখনো কখনো তাদের ধর্মীয় রীতিতেও অংশ নেন, অথচ রীতিগুলোর অর্থ ও পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে তারা হয়তো খুব বেশি জানেন না।

চুসক, 추석, শব্দটি চীনা অক্ষর থেকে এসেছে। চু অর্থ শরৎ এবং সক অর্থ সন্ধ্যা। অর্থাৎ চুসকের আক্ষরিক অর্থ “শরতের সন্ধ্যা”। এটি চান্দ্র অষ্টম মাসের ১৫ তারিখে পালিত হয় এবং পূর্ণিমা, নতুন ফসল ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে এটি বহু প্রাচীন উৎসব।

অন্যদিকে সলনাল হলো বছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ চান্দ্র নববর্ষের দিন। প্রাচীন ইরানি সংস্কৃতিতেও নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ছিল নওরোজ, আর শরৎ ও ফসলের পরিপূর্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল মেহেরজান। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় আমরা দেখি, ঋতু, কৃষি, নতুন বছর, ফসল ও মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে বড় বড় উৎসব গড়ে উঠেছে। মেহরেগানকে প্রাচীন ইরানি ঐতিহ্যে শরৎ ও পরিপূর্ণতার সঙ্গে যুক্ত করা হতো।

শরৎ এলেই প্রকৃতির চেহারা বদলে যায়। বর্ষার মেঘ সরে যায়, আকাশ পরিষ্কার হয়, বাতাসে শীতের আগমনী অনুভূতি আসে। বাংলায় কাশফুলের সৌন্দর্য শরতের পরিচয় বহন করে। আর কোরিয়ায় শরৎ হলো স্বচ্ছ আকাশ, সুন্দর আবহাওয়া, নতুন ফসল এবং পূর্ণিমার অপূর্ব সমন্বয়ের সময়।

চুসকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন ফসল ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ। ঐতিহ্যগতভাবে নতুন ফসল দিয়ে খাবার তৈরি করা, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আচার পালন করা এবং কবর পরিদর্শন করা চুসকের সংস্কৃতির অংশ।

এখানে বাংলাদেশের নবান্নের সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নবান্ন মূলত হেমন্তের নতুন ধান ও নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। আর কোরিয়ার শরৎও অনেকটা আমাদের বাংলার হেমন্তের মতো, শীতের আগমনের ঠিক আগের নির্মল ও মনোরম সময়।

একইভাবে বৌদ্ধ সংস্কৃতিতেও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। মধু পূর্ণিমা তার একটি উদাহরণ। অর্থাৎ চাঁদ, পূর্ণিমা, ঋতু ও মানুষের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জীবন, এসবের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে গভীর সম্পর্ক দেখা যায়।

কোরিয়ার মানুষ চুসককে অনেক আবেগ দিয়ে উদযাপন করে। তাদের কাছে একটি সাধারণ ধারণা হলো, “আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন বলেই আজ আমরা আছি।” তাই পরিবার একত্র হয়, খাবার তৈরি করে, পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে এবং অনেকেই পূর্বপুরুষদের কবর পরিদর্শন করেন।

তবে আধুনিক কোরিয়ায় কবর দেওয়ার বদলে দাহপ্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। কবর দেওয়া এখানে প্রায় নিষিদ্ধ এখন।

পশ্চিমা বিশ্বেও শরৎকাল ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত উৎসব আছে, থ্যাংকসগিভিং (Thanksgiving)। আমেরিকায় ১৬২১ সালের একটি হারভেস্ট ফিস্ট, অর্থাৎ ফসল কাটার পরের ভোজ, এর ইতিহাসের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। পরবর্তীতে এটি আমেরিকার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।

ঐতিহাসিকভাবে Thanksgiving-এর মধ্যে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ অবশ্য এটি অনেক আমেরিকানের কাছে ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে পরিবার, খাবার, মিলন ও কৃতজ্ঞতার একটি জাতীয়-সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

একজন মুসলমান এসব উৎসবকে কীভাবে দেখবে?

আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার।

আমরাও কৃতজ্ঞ। আমরাও পরিবারকে ভালোবাসি। আমরাও বাবা-মা ও পূর্বপুরুষদের সম্মান করি। তাদের জন্য দোয়া করি। কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত কৃতজ্ঞতা কোনো মানুষ, পূর্বপুরুষ, প্রকৃতি কিংবা চাঁদের কাছে নয়।

আমরা বিশ্বাস করি, জীবন দিয়েছেন আল্লাহ।

আলো, বাতাস, পানি দিয়েছেন আল্লাহ।

ফসল, রিজিক, পরিবার, সুস্থতা এবং পৃথিবীর অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন আল্লাহ।

তাই পূর্বপুরুষদের সম্মান করা আমাদের দায়িত্ব, কিন্তু চূড়ান্ত শুকরিয়া একমাত্র আল্লাহর জন্য।

কোরিয়ার চুসক আমাদের একটি বিষয় ভাবার সুযোগ করে দেয়। মানুষ হাজার বছর ধরে ফসল, পরিবার, প্রকৃতি, জীবন ও প্রাপ্তির সামনে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। কিন্তু একজন মুসলমান জানে, এই সব নিয়ামতের পেছনে রয়েছেন এক মহান দাতা, আল্লাহ তায়ালা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের অন্যের সংস্কৃতিকে বোঝার জ্ঞান দিন, নিজের ঈমান ও পরিচয়কে অটুট রাখার হিকমাহ দিন এবং তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দিন।

관련 글